নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সর্বপ্রথম আওলাদইবনু রসূলিল্লাহ সাইয়্যিদুনা হযরত কাসিম আলাইহাস সালাম উনার ফযীলত, বুজুর্গী ও সম্মান
উসওয়াতুন হাসানাহ | ৫ শা’বান, ১৪৩৫ হি:

রঈসুল মুফাসসিরীন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু তিনি বলেন- নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সর্বপ্রথম আওলাদ আলাইহিস সালাম হচ্ছেন সাইয়্যিদুনা হযরত ক্বাসিম আলাইহিস সালাম। যিনি উম্মাহাতুল মু’মিনীন, সাইয়্যিদাতু নিসায়িল আলামীন সাইয়্যিদাতুনা হযরত খাদিজাতুল কুবরা আলাইহাস সালাম উনার পবিত্র রেহেম শরীফ মুবারকে তাশরীফ মুবারক এনেছেন পবিত্র মক্কা শরীফে। পবিত্র নুবুওয়াত মুবারক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের পূর্বে। আর উনার মুবারক নামে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযুুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কুনিয়াত মুবারক হয় আবুল ক্বাসিম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। (আত তাবাকাতুল কুবরা-১/১৩৩ আসাহহুস সিয়ার-৬৬, আস সীরাতুল হালাবিয়া-৩/৩৯১ সীরাতুন নবী- ২/৬৩৮ জামিউল আছার-২/১১৬৫, সীরতে ইবনে হিশাম-১/৩২৬, মাওয়াহিবুল লাদুননিয়া-৪/৩১৬৯, তারীখুত তাবারী-১/৫২১)

উল্লেখ যে, ابو শব্দটি সাধারণ অর্থ পিতা। ইহা ছাড়াও ذو صاحب বা অধিকারী অর্থেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন নাবিইয়ীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সর্বাপেক্ষা বা সর্বাধিক শ্রেষ্ঠতম বণ্টনকারী। সৃষ্টি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মহান আল্লাহ পাক উনার সমস্ত নিয়ামত রাজী সৃষ্টির মধ্যে বণ্টনকারী। সে হিসেবেও উনার পবিত্র সম্মানিত কুনিয়াত মুবারক হয়েছেন আবুল ক্বাসিম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عن حضرت ابى هريرة رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم تسموا باسمى ولاتكتنوا بكنيتى فانى انا ابو القاسم صلى الله عليه وسلم.

অর্থ: হযরত আবু হুরাইরা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন- আপনারা আমার মুবারক নামে নাম রাখুন। আর আমার কুনিয়াত মুবারকে কেউ কুনিয়াত রাখবেন না। কেননা, আমিই আবুল ক্বাসিম ছল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম তথা সর্বাপেক্ষা বা সর্বাধিক শ্রেষ্ঠতম বণ্টনকারী। (তবাকাতে ইবনে সা’দ-১/১০৬)

হযরত আবু হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু তিনি আরো বলেন- নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

لاتجمعوا اسمى وكنيتى انا ابو القاسم الله يعطى وانا اقسم

অর্থ: তোমরা আমার নাম মুবারক এবং কুনিয়াত মুবারক এক সাথে রাখবেনা। কেননা, আমি হযরত আবুল ক্বাসিম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। মহান আল্লাহ পাক তিনি হাদিয়া করেন, আর আমি তোমাদের মাঝে বণ্টন করে থাকি।  (তাবাকাতে ইবনে সা’দ-১/১০৬)

 

ইবনু রসূলিল্লাহ, ক্বায়িম-মক্বামে রসূলিল্লাহ সাইয়্যিদুনা হযরত কাসিম আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র নাম মুবারক অনুসারে আখিরী রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র কুনিয়াত (উপনাম) মুবারক হয়েছে আবুল কাসিম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। বিশিষ্ট ছাহাবী খাদিমু রসূলিল্লাহ হযরত আনাস ইবনে মালিক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন,

كان النبى صلى الله عليه وسلم فى السوق فقال رجل ياابا القاسم فالتفت اليه النبى صلى الله عليه وسلم فقال انما دعوت هذا فقال النبى صلى الله عليه وسلم سموا باسمى ولاتكتنوا بكنيتى .

অর্থ- “একদিন নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি বাজারে ছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি ‘হে আবুল কাসিম’ বলে ডাক দিলো। তখন নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তার দিকে তাকালেন। লোকটি বললো, আমি (আপনাকে ডাকিনি) ওই ব্যক্তিকে ডেকেছি। তখন নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করলেন, তোমরা আমার মুবারক নামে নাম রাখো। কিন্তু আমার কুয়িনাত মুবারকে (উপনাম) নাম রাখবে না।” (মিশকাত শরীফ- ৯/৫৩, তাবাকাতে ইবনে সা’দ ১/১০৬)

উল্লেখ্য যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র বিছাল শরীফ গ্রহণ তথা দুনিয়া থেকে পর্দা করার পূর্ব পর্যন্ত এই হুকুম মুবারক কার্যকর ছিলো। আর পবিত্র বিছাল শরীফ গ্রহণ বা মহান আল্লাহ পাক উনার পরম দীদার মুবারকে গমনের পর উনার কুনিয়াত মুবারকে অথবা মুবারক নাম ও মুবারক কুনিয়াত একই সাথে রাখা জায়িয রয়েছে।

বিশিষ্ট তাবিয়ী সাইয়্যিদুনা হযরত মুহম্মদ ইবনে হানাফিয়্যাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার সম্মানিত পিতা বাবুল ইলমি ওয়াল হিকাম সাইয়্যিদুনা হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার থেকে বর্ণনা করেন, তিনি ইরশাদ মুবারক করেন,

قلت يا رسول الله صلى الله عليه وسلم ارايت ان ولد لى بعدك ولد اسميه باسمك واكنيه بكنيتك قال نعم.

অর্থ- “আমি নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত খিদমত মুবারকে আরজ করলাম, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনার পবিত্র বিছাল শরীফ গ্রহণের পর যদি আমার কোনো পুত্র সন্তান বিলাদত শরীফ গ্রহণ করেন তাহলে আমি কি আপনার সম্মানিত নাম মুবারক এবং সম্মানিত কুনিয়াত মুবারকে উনার নাম ও কুনিয়াত রাখতে পারবো? তিনি ইরশাদ মুবারক করলেন, হ্যাঁ, রাখতে পারবেন।” (মিশকাত শরীফ ৯/৬১)

স্মর্তব্য যে, আমিরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন, বাবুল ইলমি ওয়াল হিকাম হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার একজন আহলিয়া ছিলেন সাইয়্যিদাতুনা হযরত খাওলা বিনতে জাফর রহমতুল্লাহি আলাইহা। তিনি ছিলেন হানাফিয়্যাহ গোত্রীয় মহিলা। বাবুল ইলমি ওয়াল হিকাম সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার ছেলে সাইয়্যিদুনা হযরত মুহম্মদ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি এই আহলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহা উনার রেহেম শরীফে তাশরীফ এনেছেন। তিনি উনার সম্মানিত মাতা উনার দিকে সম্বোধিত হয়ে পরিচিতি হয়েছেন। আর উনার কুয়িনাত মুবারক ছিলো আবুল কাসিম রহমতুল্লাহি আলাইহি।

 

আবুল কাসিম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ মুবারক নামে নাম বা কুনিয়াত রাখা কিংবা সম্বোধন বা ডাকার আহকাম:

সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক কুনিয়াত ছিলো আবুল কাসিম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

পবিত্র হাদীছ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে, বিশিষ্ট ছাহাবী হযরত আনাছ ইবনে মালিক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন-

ان النبى صلى الله عليه وسلم كان بالبقيع فنادى رجل ياابا القاسم فالتفت اليه النبى صلى الله عليه وسلم فقال لم اعنك فقال النبى صلى الله عليه وسلم سموا باسمى ولاتكتنوا بكنيتى .

অর্থ: “একবার নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র জান্নাতুল বাক্বী শরীফে অবস্থান করতেছিলেন। সেখানে এক ব্যক্তি ‘ইয়া আবাল কাসিম’ বলে ডাক দিলেন। ডাক শুনে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে ব্যক্তির দিকে তাকালেন। সে ব্যক্তি বললো, আমি তো আপনাকে ডাকিনি। (আমি ওই ব্যক্তিকে ডেকেছি।) তখন নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করলেন, “তোমরা আমার নাম মুবারকে নাম রাখতে পারো। তবে আমার কুনিয়াত মুবারকে নাম রাখবে না।” (তাবাকাতে ইবনে সাদ ১-১০৬)

আলোচ্য পবিত্র হাদীছ শরীফ থেকে অনেকগুলো মাসয়ালা ইস্তিম্বাত হয়েছে-

১। সুন্দর অর্থবোধক আরবী তথা পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ অনুযায়ী নাম রাখার সাথে সাথে কুনিয়াত বা উপনাম রাখা সুন্নত মুবারক। যাকে (ডাক নাম) বলে থাকে।

২। মূল নামে ডাকা বা সম্বোধন করা আদব বা শরাফত-ভদ্রতার খিলাফ।

৩। কুনিয়াত বা উপনাম রাখা ছিলো আরবগণ উনাদের আভিজাত্যের প্রতীক।

৪। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র বিছাল শরীফ গ্রহণ তথা দুনিয়া হতে পর্দা করার পূর্ব পর্যন্ত উনার পবিত্র কুনিয়াত মুবারকে (আবু কাসিম) নাম বা কুনিয়াত রাখা নিষেধ ছিলো। তবে পবিত্র বিছাল শরীফ গ্রহণ করার পরে তা রহিত হয়ে যায়।

৫। নিজ শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার মুবারক নাম এবং মুবারক কুনিয়াত অনুসারে নাম বা কুনিয়াত রাখা আদবের খিলাফ।

৬। নিজ শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার মুবারক নামে কিংবা কুনিয়াত মুবারকে যদি কেউ পরিচিত (মুরীদ হওয়ার পূর্বে রাখার কারণে) হয় তাহলে তাকে সে নামে বা কুনিয়াতে ডাকা বা সম্বোধন করা আদবের খিলাফ। এমনকি তাতে হালাক্বী বা ধ্বংসের সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার সম্মানিত আহাল-ইয়াল পাক আলাইহিমুস সালাম উনাদের ক্ষেত্রে ও এই হুকুমই প্রযোজ্য।

৭। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক নামে কিংবা মুবারক কুনিয়াতে কেউ নাম বা কুনিয়াত রাখলে তাকে যেমন সে মুবারক নাম ও কুনিয়াতের জন্য সম্মান করা, তা’যীম-তাকরীম করা উচিত। তেমনি নিজ শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার নাম মুবারক কিংবা কুনিয়াত মুবারকে কারো নাম বা কুনিয়াত হলে তাকেও সম্মান করা, মুহব্বত করা উচিত। যা নিজ শায়েখ আলাইহিস সালাম উনার নৈকট্য-তাওয়াল্লুক, নিছবত মুবারক বৃদ্ধির কারণ।

৮। মুরীদ হওয়ার পূর্বে বা বাইয়াত গ্রহণের পূর্বে কারো নাম যদি স্বীয় শায়েখ আলাইহিস সালাম উনার নাম মুবারকে হয়ে থাকে তাহলে মুরীদ হওয়ার পর তা পরিবর্তন করতঃ অন্য নাম বা কুনিয়াত রাখা উচিত।

সূত্র : দৈনিক আল ইহসান

বিষয় : হযরত আওলাদ আলাইহিমুস সালাম, ইবনু রসূলিল্লাহ, সাইয়্যিদুনা, হযরত কাসিম, আলাইহাস সালাম, সম্মানিত, আওলাদ, ফাযায়িল, ফযীলত, মুবারক
এই বিভাগ থেকে আরও পড়ুন
« পূর্ববর্তী| সব গুলি| পরবর্তী »