সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন নাবিয়্যিন, হায়াতুন নবীনূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বেমেছাল বরকতময় পবিত্র ছূরত মুবারক
উসওয়াতুন হাসানাহ | ২৭ শা’বান, ১৪৩৫ হি:

মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন:

“নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সুন্দরতম অবয়বে (আকৃতিতে) সৃষ্টি করেছি।”

মহান আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন সমস্ত মাখলুক সৃষ্টির পূর্বে সর্ব প্রথম উনার প্রিয় হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নূর মুবারক সৃষ্টি করেন। মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নূর মুবারক হতে পর্যায়ক্রমে সমস্ত কিছু সৃষ্টি করা হয়েছে। উনার সৌন্দর্য্যতা হতে সমস্ত কিছু সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়েছে, সেই পূতঃ পবিত্র সৌন্দর্যের আধার, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রকৃত সৌন্দর্য বর্ণনা করার উপযুক্ত কোন ভাষা এবং দৃষ্টান্ত এ পৃথিবীতে নেই। তবুও ক্ষুদ্র জ্ঞানসম্পন্ন মানব মনে একটা সুন্দরতম অবয়ব কল্পনার মানসে বিভিন্ন সৃষ্ট বস্তুর সাথে উনার অনুপম সৌন্দর্যের মেছাল দেয়া হয়।

মূলতঃ উনার অতুলনীয় নূরের স্নিগ্ধতা বর্ণনা দেয়ার যোগ্যতাই কোন মানুষের নেই। তবে তা একান্তই অনুভবের বিষয়। উনার অনুপম সৌন্দর্যরাশি এবং আকৃতি মুবারক বর্ণনা করার অপেক্ষা রাখে না। উনার উছিলায় মানব জাতির উৎপত্তি, সেই মানুষের সুন্দরতম আকৃতি বর্ণনায় মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন: নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সুন্দরতম অবয়বে (আকৃতিতে) সৃষ্টি করেছি।

মহান আল্লাহ পাক উনার অনুপম চরিত্র মুবারক সম্পর্কে বলেন,

“নিঃসন্দেহে আপনি উন্নত চরিত্রের উচ্চতম স্তরে আছেন।” [পবিত্র সূরা ক্বলাম- পবিত্র আয়াত ৪]

মুবারক সীরত-ছূরত এবং আকৃতি-প্রকৃতি সম্পর্কে অসংখ্য হাদীছ শরীফ বর্ণিত রয়েছে। হযরত ইমাম কুরতুবী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হুযূর পুর নূর ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দেহ মুবারক উনার পরিপূর্ণ সৌন্দর্য প্রকাশ করা হয়নি। যদি তা প্রকাশ করা হতো, তবে কোন মানুষ উনার প্রতি তাকাতে পারতো না।

এ প্রসঙ্গে উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম বলেন,

“জুলায়খার সখীগণ যদি হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উজ্জ্বল নূরানী চেহারা মুবারক দেখতো, তবে হাত কাটার পরিবর্তে তারা তাদের কলিজা কেটে ফেলত।” উনার চরিত্র মাধুর্য এবং অনুপম সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কোন বর্ণনাকারী শুধু এতটুকুই বলতে পারতো, “উনার মত সৌন্দর্যবান পুর্বেও কখনো দেখিনি আর পরেও না।”

জাহেরী ভাবে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার যে মানবীয় ছুরত মুবারক দৃষ্টত হয়েছে সে পবিত্র সীরত-ছূরত এবং আকৃতি মুবারক উনার অতি সামান্য বর্ননা সংক্ষেপে আমাদের সীমিত ভাষায় তুলে ধরা হলো-

নূর মুবারক দ্বারা তৈরী পবিত্র জিসিম (শারীর) উনার গঠন মুবারক:

  • পবিত্র দেহ মুবারক সুন্দর, সুঠাম-সুগঠিত। না অতিকায় দীর্ঘ, আর না খাঁটো। বরং যথোপযুক্ত মধ্যমাকৃতির। মুবারক দেহের রং ছিল, চাঁদের চেয়েও উজ্জ্বল ও নূরানী। দুধে আলতার মিশ্রণে যা হয়। কেউ কেউ প্রদীপ্ত সূর্যের মত উজ্জ্বল বলে বর্ণনা করেছেন। কোনও কোনও বর্ণনায় এসেছে পাকা গমের রঙ সদৃশ।
  • পবিত্রতম দেহ মুবারক উনার চর্ম মুবারক রেশম অপেক্ষা অধিক মসৃণ এবং কোমল।
  • চেহারা মুবারক অতীব লাবণ্যময়, কমলকান্ত- নূরানী। জ্যোৎসনার চাঁদের চেয়েও আলোকোজ্জ্বল-জ্যোতির্ময়, অনুপম সৌন্দর্যমণ্ডিত। সামান্য গোলাকৃতি, হালকা গড়ন, আকর্ষণীয় পৌরুষদীপ্ত, মনোলোভা মায়াময়ী।
  • প্রশস্ত ললাট মুবারক, ভ্রুযুগল সুন্দর সরু, ঘন এবং হালকা ভাবে সম্মিলিত। যা দূর থেকে দেখলে পৃথক মনে হতো।
  • চক্ষু মুবারক উনার পাতা বড়, নয়নাভিরাম, চোখের মণি মুবারক ঘন কালো, পলক বড় এবং চিত্তাকর্ষক। মণিদ্বয়ের পার্শ্বস্থ সাদা অংশ ঈষৎ রক্তিমাভ। পবিত্র চক্ষুযুগলে সর্বদা সুরমা লাগানো মনে হত।
  • মুবারক কপোলদ্বয় অর্থাৎ গাল মুবারক কমনীয়, হালকা পুরু গোশ্ত মুবারক। যা দেখতে সমতল।
  • নাসিকা মুবারক সামান্য দীর্ঘ-উজ্জ্বল, জ্যোতির্ময়। প্রথমে দেখলে বড় মনে হতো। কিন্তু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যেত, নূরের আতিশয্যে তা বড় মনে হচ্ছে। অন্যথায় তা বেশি বড় নয়, তবে অবশ্যই মানানস-সুন্দর।
  • পবিত্র মুখ গহব্বর মুবারক সুপ্রশস্ত।
  • ঠোঁট মুবারক মোটাও নয় আবার একেবারে পাতলাও নয়। বরং তা পরিমিত পাতলা এবং চিকন-মানানসই। দেখতে মনোরম এবং লালাভ মিষ্টি রংয়ের।
  • দাঁত মুবারক ছিল সফেদ-শুভ্র, মনোরম, রজতকান্তি, সুমসৃণ ও উজ্জ্বল। তা অধিক সংযুক্ত নয়। বরং সম্মুখের দন্ত মুবারক ছিল সামান্য ফাঁক, হাসির সময় তা মুক্তার মত চমকাতো, কথা বলার সময় তা হতে নূর বিচ্ছুরিত হতো।
  • কান মুবারক বড়ও নয় এবং ছোটও নয়, বরং তা মাঝারি ধরনের সুন্দর-মানানসই।
  • দাড়ি মুবারক সুন্দর, ঘন এবং পরিপূর্ণ।
  • মাথা মুবারক পরিমিত বড়।
  • পবিত্র মাথা মুবারকের কেশ বা চুল মুবারক হালকা ঢেউ খেলানো বাবরী, যা কান মুবারকের লতি মুবারক পর্যন্ত বিলম্বিত। বড় হলে তা কাঁধ মুবারকের উপর পর্যন্ত থাকতো, কিন্তু কাঁধ মুবারক স্পর্শ করতোনা। মাথা মুবারকের মধ্যভাগে সিঁথি মুবারক কাঁটতেন, কখনো খেযাব ব্যবহার করেননি। তবে তেল ব্যবহার করতেন। উনার ৬৩ বৎসর দুনিয়াবী হায়াত মুবারকে সর্বমোট ১৪-২৮টি চুল এবং দাড়ি মুবারক পেঁকেছিল।
  • ঘাড় মুবারক সমুচ্চ, পুর গোশ্ত (ভরাট), মুবারক স্কন্ধদ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থান মুবারক চওড়া।
  • পৃষ্ঠ মুবারক সুডৌল, সুগঠিত এবং তা পশমযুক্ত।
  • বক্ষ মুবারক প্রশস্ত এবং চওড়া, যা বীরত্ব ব্যঞ্জক। পবিত্র বক্ষদেশ মুবারক হতে নাভীমূল মুবারক পর্যন্ত হালকা পশম মুবারকের সরু রেখা বিদ্যমান। এছাড়া বুক মুবারকের দু’পাশ এবং পেট মুবারক লোমশুন্য। পেট মুবারক মোটা অথবা ভূঁড়িযুক্ত নয়। বরং তা, সমতল এবং মানানসই।
  • পূণ্যময় দু’বাহু, কাঁধ ও বক্ষ মুবারকের উপরের অংশ পশমযুক্ত দেখা গেছে। পিঠ মুবারক এবং মুবারক হস্তদ্বয়ের কব্জি মুবারকের উপরিভাগেও পরিমিত পশম মুবারকের আবরণ লক্ষিত হয়েছে।
  • মুবারক কনুই হতে কর পল্লব মুবারক পর্যন্ত অংশ পরিমিত লম্বা ছিল। কর পল্লব পুর গোশ্ত এবং চওড়া। হাত মুবারকের তালুও ছিল প্রশস্ত। বরকতময় হাত-পা মুবারকের আঙ্গুল মুবারক যথোপযুক্ত দীর্ঘ।
  • সুগঠিত পূতঃপবিত্র উরু ও পদযুগল। মুবারক পায়ের মুবারক গোড়ালীদ্বয় হালকা, মুবারক পায়ের পাতা মুবারক মসৃণ পুরগোশ্ত। পবিত্র পা মুবারকের তালু মুবারকের মধ্যভাগ খানিকটা হালকা ও খালি ছিল, যার নীচ দিয়ে অনায়াসে পানি বয়ে যেত।
  • মুবারক দেহের জোড়ায় অস্থিসমূহ ছিল মজবুত।
  • চেহারা মুবারকের উপর পবিত্র ঘর্ম বিন্দু মুক্তার ন্যায় ঝলমল করত। মনে হতো যেন নূর ঝরে পড়ছে। পবিত্রতম শরীর থেকে নির্গত নূরুত ত্বীব (ঘাম) মুবারক এতই খোশবুদার যে তা মেশ্ক-আম্বর হতেও অধিক সুগন্ধযুক্ত।
  • মুবারক স্কন্ধদ্বয়ের মধ্যখানে কবুতরের ডিমের মত সামান্য উঁচু গোশতের একটি টুকরো ছিল যা “মোহরে নুবুওওয়াত।” এর চারপাশে মশুরের মত তিল লক্ষিত হয়েছে বলে বর্ণনা রয়েছে। “মোহরে নুবুওওয়াত” উনার রং দেখা গিয়েছে হালকা লাল। তবে কেউ কেউ অন্য রংও বর্ণনা করেছেন।
  • মধ্যমদেহী, সুঠাম ও সুগঠিত স্বাস্থ্য মুবারকে উনার পৌরুষদীপ্ত ভাবগম্ভীর চেহারা মুবারক দেখলে অন্তরে ভয়ের সঞ্চার হতো। নীরব থাকার সময়ে অত্যন্ত ভাবগম্ভীর এবং কথা বলার সময় হাসি-খুশী থাকতেন।

ছুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি ছুবহানাল্লাহিল আ’যিম!!!

মহান আল্লাহ পাক আওলাদে রসূল, নকশায়ে রসূল, রসূলে নোমা, হাবীবুল্লাহ রাজারবাগ শরীফ উনার সাইয়্যিদুনা মামদূহ হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার উছিলায় নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার হাক্বীক্বী ছূরত মুবারকের দায়েমী দিদার নসীব করুন। (আমীন)

[সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূর নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পূর্ণময় ছূরত মুবারকের অনুরূপ বর্ণনা শামায়েলে তিরমিযী, সীরাতুন্নবী সহ অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সীরত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখ আছে।]

সূত্র : মাসিক আল বাইয়্যিনাত, ৩৬তম সংখ্যা

বিষয় : ফাযায়িল-ফযীলত ও পবিত্রতা, আখেরী নবী, হাবীবুল্লাহ, নূরে মুজাসসাম, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, বরকতময়, ছূরত মুবারক
এই বিভাগ থেকে আরও পড়ুন
« পূর্ববর্তী| সব গুলি| পরবর্তী »