প্রসঙ্গ পবিত্র ওহী মুবারক পবিত্র রিছালত উনার আগে ও পরে হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অভিন্ন মানস মুবারক
উসওয়াতুন হাসানাহ | ২৭ শা’বান, ১৪৩৫ হি:

মহান আল্লাহ্ পাক উনার প্রিয়তম হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে সৃষ্টির শুরু থেকেই নবী, রসূল ও হাবীব হিসেবে সৃষ্টি হয়েছেন। সুবহানাল্লাহ! তবে দুনিয়াবী জিন্দেগীতে উনাকে চল্লিশ বৎসর বয়স মুবারকে রিসালাত প্রদানের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। নিজেকে প্রকাশের প্রত্যাশিত পরম লক্ষ্যে মহান আল্লাহ্ পাক সকল সৃষ্টির আগে, উনার হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সৃষ্টি করেন এবং সৃষ্টির পূর্বেই উনাকে নবী মনোনীত করে রাখেন।

এ মর্মে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

“হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম উনার দেহ মুবারকে যখন প্রাণের সঞ্চার হয়নি তখন আল্লাহ্ পাক আমার নিকট থেকে নুবুওওয়াতের শপথ নিয়েছেন।”

তিনি আরো বলেন,

“হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম কে সৃষ্টির পূর্বে, চৌদ্দ হাজার বছর ধরে আমি আমার প্রভু (রব) সমীপে নূর ছিলাম।”

মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন এই নূর মুবারকেই নুবুওওয়তের খিলআত পরিয়ে সৃষ্টির পূর্বেই, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার রিসালতের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের জন্য, সকল নবী-রসূল আলাইহিমুস সাল্লামগণের শপথ নিয়েছেন।

সর্বপ্রথম নবী হয়ে, সকলের শেষে প্রেরিত হওয়ার তাৎপর্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হয়ে হযরত ইমাম বাকির আলাইহিস সালাম জবাব দিয়েছেন,

“রোজ আযলে মহান আল্লাহ্ পাক যখন সৃষ্ট সমুদয় রূহ্কে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই? তারা স্বীকার করলো- “হ্যাঁ।” সর্ব প্রথম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জবান মুবারক থেকেই স্বীকারোক্তিসূচক “হ্যা” উচ্চারিত। এ কারণেই তিনি সকলের প্রথম, যদিও সকলের শেষে প্রেরিত।”

ওহী প্রাপ্তির আনুষ্ঠানিক ঘটনা চল্লিশ বছর বয়স মুবারকে সংঘটিত হলেও, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নুবুওওয়াতের পূর্বের “আল্ আমীন” মানস মুবারক ও নুবুওওয়াত লাভোত্তর রসূল মানস মুবারক অভিন্ন। অভিন্ন এজন্য যে, নুবুওওয়াত ও রিসালত এমন খাছ নিয়ামত, যা দুনিয়ায় আগমনের পর যোগ্যতায় উত্তীর্ণ হয়ে লাভ করা যায় না। এ কাজটি সংঘটিত হয়ে থাকে আসমানে।

কালামুল্লাহ্ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ হয়েছে,

“আল্লাহ্ পাক সম্যক অবগত আছেন যে, কোথায় উনার রিসালত রাখতে হবে (উনার কাকে দান করতে হবে)”।

মহান আল্লাহ্ পাক আরো বলেছেন,

“আল্লাহ্ পাক ফেরেশতাগণ হতে বাণীবাহক মনোনীত করেন এবং মানববৃন্দ থেকেও রসূল মনোনীত করেন, নিশ্চয় আল্লাহ্ পাক শ্রবণকারী ও দ্রষ্টা”।

ওহী, ইলহাম ও ইলকা শ্রবণ, অনুভব, ধারণ, অনুশীলন ও বাস্তবায়নের অনুপম যোগ্যতা আদিকাল থেকেই প্রবৃত্তিতে নিবিষ্ট থাকে। এ যোগ্যতা জাগতিক প্রশিক্ষণে অর্জিত হবার নয়। হিদায়েত দানের অনিবার্য কাজটি পথভ্রষ্ট লক্ষ্যবিচ্যূত মানুষের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ায় নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম গণ উনাদের নুবুওওয়াত ও রিসালত প্রাপ্তির আনুষ্ঠানিকতা বিলাদত শরীফ উনার পর জাগতিক জীবনের নির্ধারিত সময়কালে সংঘটিত হয়ে থাকে। হিদায়েত আল্লাহ্ পাক উনার তরফ থেকে হলেও, দুনিয়ার মানুষকে গায়রুল্লাহ্ থেকে ফিরিয়ে আল্লাহ্ মুখী করে তোলার প্রক্রিয়াটি একজন নবী বা রসূল উনার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকে। দৃশ্যত তিন মানুষ ছুরতে হওয়া সত্ত্বেও তিনি নবী, তিনি রসূল।

যেমন মহান আল্লাহ পাক বলেন,

“আপনি (হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মানুষদের বলুন, আমি মিছাল বা ছুরতান তোমাদের মতোই মানুষ, কিন্তু হাক্বীক্বতান আমার নিকট মহান আল্লাহ্ পাক উনার ওহী মুবারক আসে।”

কিন্তু তিনি এমন মানুষ, যিনি পরিপূর্ণরূপে আল্লাহ্ পাক কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। এই নিয়ন্ত্রণের ব্যাখ্যায় আল্লাহ্ পাক বলেন,

“তিনি মনগড়া কথা বলেননা। উনার মুখ নিঃসৃত বাণী ওহীর মাধ্যমে আসে।”

সৃষ্টির সূচনালগ্নে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি সকল নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম গণের শপথ নিয়ে উনাদেরকে দুনিয়ায় আগে পাঠিয়ে আপন হাবীবকে পরে পাঠিয়েছেন এবং হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক উছিলায় নিয়ামত প্রদানে তাঁদেরকে সমৃদ্ধ করেছেন। সৃষ্টি, দুনিয়ায় আগমন, আনুষ্ঠানিক রিসালত প্রাপ্তি, হিদায়েত দান, ইসলাম প্রতিষ্ঠা, ওফাত, পরকালে শাফায়াতের আবেহায়াত দান, ইত্যাদি সামগ্রিক বিষয়ের ধারাবাহিকতায় হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রিসালত প্রকাশের আগে ও পরে অভিন্ন। শুধু দৃশ্যতঃ এ সকল বিষয় প্রকাশ, বিকাশ ও বাস্তবায়নের পর্যায়ক্রমিক ধারা নির্ধারিত সময়ভিত্তিক ব্যবধান সূচিত হয়েছে মাত্র।

পবিত্র সূরা আল ফাতিহা শরীফ উনার মধ্যে মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ মুবারক করেন,

“সমুদয় প্রশংসা আল্লাহ তা’আলার, যিনি নিখিল সৃষ্টি জগতের প্রতিপালক।”

পবিত্র সূরা আল্ আম্বিয়া শরীফ উনার মধ্যে মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ মুবারক করেন,

“আমি (মহান আল্লাহ পাক) আপনাকে (হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সমুদয় সৃষ্টি জগতের রহমত হিসেবে দুনিয়ায় পাঠিয়েছি।”

এ আয়াত শরীফ দু’টির যোগসূত্র হলো যে, মহান আল্লাহ পাক যে সৃষ্টি জগতসমূহের প্রতিপালক, নূরে মুজাসসাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরিপূর্ণরূপে সে সৃষ্টি জগতসমূহের জন্য খাছ রহমত। এ রহমত ওহী আসার পরে নূরে মুজাসসাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মধ্যে অনুপ্রবেশ করেনি। সামগ্রিকভাবে রহমতের পরিপূর্ণ ভাণ্ডার রূপেই তিনি সৃষ্ট হয়েছেন, দুনিয়ায় এসেছেন, আনুষ্ঠানিকভাবে রিসালত পেয়েছেন। তিনি সমগ্র সৃষ্টির উপলক্ষ, সৃষ্টিসমূহ পরিচালনা ও সঞ্জীবিত রাখার জন্য প্রেরিত রহমত। অনাবৃষ্টি, মহামারী, দুর্যোগ, দ্বন্দ্ব ও সংঘাতে আরবের মরুময় জনপদের অতিষ্ঠ শিশু-কিশোর ও মানুষরা নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পবিত্র কা’বা শরীফ উনার সম্মুখে এনে উনার মুবারক উছিলায় প্রার্থনা জানালে, মহান আল্লাহ পাক তাদের প্রার্থনা তাৎক্ষণিকভাবে কবুল করেন। (সুবাহানাল্লাহ) উনার সদ্বভাব ও কোমলান্তকরণ মমতার কারণে, আরবের অধিবাসীরা উনাকে লক্বব দিয়েছে “আল আমীন।” রহমতের ভাণ্ডার, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কেন্দ্র করেই সৃষ্টিকুল অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বলাভ করেছে এবং নিখিল সৃষ্টি এ রহমতের অনিবার্য সঞ্জীবনী ধারার পূণ্যময় কারণেই প্রাণময় ও বিকশিত হয়ে চলমান আছে। ইন্তিকাল, ধ্বংস ও লয়ের পরে সকল কিছুই পূর্ণবার অস্তিত্ব লাভ করবে এবং অনুগতরা উনার শাফায়াত লাভে অনাদি-অনন্তকালের অনাবিল প্রশান্তি পাবে।

সমুদয় সৃষ্টিকুলের অনস্তিত্ব পর্যায়ে রিসালতের তাৎপর্য উপলব্ধি, ওহীর বাণী শ্রবণ, ধারণ ও প্রকাশের পরিপূর্ণ গুণাবলী ও যোগ্যতা লাভ করা সত্ত্বেও একাধিকবার হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বক্ষ মুবারক উন্মোচন (শরহে ছদুর) কেন করা হলো? হেরা পর্বতের নিভৃত গুহায় ধ্যান-নিমগ্ন (মোরাকাবা) অবস্থানে প্রথম ওহী শ্রবণে তিনি ভীত-বিহ¡ল হলেন কেন? মি’রাজ শরীফ উনার পটভূমিতে তিনি শঙ্কিত হলেন কেন? এসব নিগূঢ় বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা অবান্তর হলেও, অনপোলব্ধির কারণে দুর্বোধ্য হওয়ায় আমাদের অনেকের মনে প্রশ্ন জাগা অস্বাভাবিক নয়। ভ্রান্তি নিরসনের লক্ষ্যে বিষয়গুলি আলোচনার দাবি রাখে। তবে বক্ষ্যমান নিবন্ধের সংক্ষিপ্ত পরিসরে আমরা কেবলমাত্র ওহীর তাৎপর্য সম্পর্কে আলোচনার প্রয়াস পাবো।

সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়ায় রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। এ রহমতের পরিধি ও পরিব্যপ্তি নশ্বর দুনিয়ায় যেমন, আখিরাতেও তেমন, অনন্তকাল ধরে বহমান। ইলম, হিক্বমত, প্রজ্ঞা, বিনয় ও আনুগত্য মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আ’লামীন উনার মন ও মননে যুগপৎ ঠাঁই করে দিয়েছেন। তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার প্রকাশ ও বিকাশের পরম উপলক্ষ। এ কারণেই তিনি পরকালের বাসিন্দা হয়েও দুনিয়ায় বসবাসকারী মিছাল বাশার ও রসূল এবং দুনিয়ায় বাস করেও নিরন্তর আখিরাতের সাথে সম্পৃক্ত। ওহী শ্রবণ, অনুভব, ধারণ ও প্রকাশের পরিপূর্ণ গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য সৃষ্টিলগ্নে প্রাপ্ত হয়েও শিশুকাল থেকেই চিন্তা, ধ্যান, তন্ময়তা ও গবেষণায় অনুক্ষণ ব্যাপৃত থেকেছেন। এ অবস্থায় থাকাই ছিল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জীবন মুবারকের প্রথম আমল। তাই বেদনাবিমুগ্ধ মানসিকতায় ওহীর জন্য তিনি অধীর অপেক্ষায় নিবিষ্ট থাকেন। এ অপেক্ষা ও প্রত্যাশায় অস্থিরতা যেমন ভুমিষ্ঠ হয়েই, ঠিক তেমনি কৈশোরে বকরী-মেষের চারণ ভূমিতে, আরবের তপ্ত মরু মাঠে, পিতৃব্য আবু তালিবের সতর্ক তত্ত্বাবধানে, হযরত খাদিজাতুল কোবরা আলাইহাস সালাম উনার মমতাময় সান্নিধ্যে, বিজন-নীরব একাকীত্বে ও গোপন প্রহরে এবং হেরা গুহার নিভৃত অবস্থানে।

অবশেষে চল্লিশ বছর বয়স মুবারকে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানে হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম ৮ই রবিউল আউয়াল ওহী নিয়ে এলেন-

“পড়ুন আপনার সেই প্রভূর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন, যিনি মানুষকে ঘনীভূত রক্তপিন্ড থেকে সৃষ্টি করেছেন। পড়ুন, আপনার রব মহা মহিমান্বিত। তিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন, যা সে জানতো না।” [পবিত্র সুরা আলাক্ব শরীফ]

সবুজ পোশাক পরিহিত হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম উনাকে দেখে এবং ওহীর বাণী শ্রবণে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাহ্যত কিছুটা চিন্তিত হলেন। এ চিন্তা এজন্য নয় যে, তিনি হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম কে দেখে সহ্য করার সহনশীলতা এবং ওহীর বাণী শ্রবণের যোগ্যতা অর্জন করেননি। (নাঊযুবিল্লাহ)

ওহী মহান আল্লাহ পাক উনার মা’রিফাতের উচ্চতম মাকামের নিগূঢ় তত্ত্বপূর্ণ বিষয়। মহান আল্লাহ পাক এবং হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যতীত অন্য কারো পক্ষে তাত্ত্বিক ও পরিপূর্ণভাবে এর তাৎপর্য উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। ওহী অর্থ গোপন ইংগিত, ইশারা, নিভৃতে আলাপন ইত্যাদি। অন্য কথায়, হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম কে সরাসরি দুনিয়ায় পাঠিয়ে উচ্চারিত শব্দে (যে উচ্চারণ বাণী বাহক ও প্রাপক ব্যতীত অন্য কেউ শুনতে পায় না) নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম গণকে মহান আল্লাহ পাক যে প্রত্যাদেশ পৌঁছে দেন, সাধারণতঃ তাই ওহী।

ওহী সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক বলেন,

“এবং কোন মানুষের ক্ষমতা নেই সে মহান আল্লাহ পাক উনার সাথে কথা বলে, কিন্তু ওহী দ্বারা অথবা পর্দার অন্তরাল হতে অথবা তিনি কোন বাণী বাহক পাঠালে তখন তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার নির্দেশানুযায়ী, যা তিনি ( মহান আল্লাহ পাক) চান, ওহীর মাধ্যমে নাযিল করেন। নিঃসন্দেহে তিনি সমুন্নত ও বিজ্ঞানময়।”

সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন পদ্ধতিতে ওহী পেতেন। পদ্ধতিগুলি নিম্নরূপ-

(১) সত্য স্বপ্ন মুবারক।

(২) হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম কর্তৃক অদৃশ্যভাবে হৃদয় মুবারকে প্রচ্ছন্ন ধারণা ও অকাট্য বিশ্বাস প্রক্ষেপণ। এমন ওহী পেয়ে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

“রিযিক পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত কখনোই কারো ইন্তিকাল হবে না।”

(৩) হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে মানুষের আকৃতিতে হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম উনার কথোপকথোন।

(৪) ঘণ্টা বাজার আওয়াজে ওহী নাযিল।

(৫) হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম নিজ অবয়বে এসে ওহী প্রদান। এ পদ্ধতিতে দু’বার অথবা তিনবার ওহী নাযিল হয়েছে।

(৬) ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদের মধ্যস্থতা ব্যতীত সরাসরি মহান আল্লাহ পাক উনার সাথে আলাপন। হযরত মুসা আলাইহিস সালাম উনার সাথেও মহান আল্লাহ পাক কালাম করেছেন। পবিত্র শবে মি’রাজ শরীফ উনার মধ্যে ওহী প্রাপ্তি নামায ফরয হওয়া, এ ওহীর দৃষ্টান্ত।

পবিত্র শবে মি’রাজ শরীফ উনার দীদারকালে পর্দার আবরণ ব্যতীত প্রত্যক্ষভাবে মহান আল্লাহ পাক উনার সাথে কথপোকথন। এ মর্মে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

“মহা পরাক্রমশালী ও গৌরাবান্বিত মহান আল্লাহ পাক উনাকে চাক্ষুষভাবে আমি দর্শন করেছি।”

মহান আল্লাহ পাক উনার মুহব্বত-মা’রিফাত হাছিলে যোগ্য করে তোলার জন্য নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম গণের নিকট মহান আল্লাহ পাক যে সকল বিধানাবলী পাঠিয়ে থাকেন, সংক্ষেপে তারই নাম ওহী।

ওহী দুই প্রকার-

(১) ওহীয়ে মাতলু (পবিত্র কুরআন শরীফ, যা তিলাওয়াত করা হয়) এবং
(২) ওহীয়ে গায়ের মাতলু (পবিত্র হাদীছ শরীফ)।

নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পূর্বেও নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম গণের নিকট ওহী নাযিল হয়েছে। যেমন- পবিত্র সুরা নিছায় ইরশাদ হয়েছে,

“নিশ্চয়ই আমি (মহান আল্লাহ পাক) আপনাকে ওহী পাঠিয়েছি, যেরূপ আমি হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম, হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম, হযরত ইসহাক আলাইহিস সালাম, হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম ও উনার সন্তানগণের প্রতি এবং হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম, হযরত আইয়ুব আলাইহিস সালাম ও হযরত ইউনুস আলাইহিস সালাম ও হযরত হারুন আলাইহিস সালাম ও হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালাম উনার প্রতি ওহী পাঠিয়েছিলাম এবং আমি হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম কে ‘যবুর’ কিতাব প্রদান করেছিলাম”।

নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম নন, এমন মানুষের প্রতিও মহান আল্লাহ পাক উনার ইচ্ছা (গোপন ইঙ্গিত) ব্যক্ত করেছেন। এরূপ ইচ্ছাকেও মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ উনার মধ্যে ওহী হিসেবে অভিহিত করেছেন। যেমন ফিরাউনের কবল থেকে নবী হযরত মুসা কালীমুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার শিশু অবস্থায় হিফাযতের জন্য উনার মাকে ওহী করেছেন,

“(সে সময়ের কথা স্মরণ করুন) যখন আমি আপনার মাকে ওহীর মাধ্যমে প্রদত্ত বিষয়ে গোপন ইঙ্গিত (ওহী) করেছিলাম।

মৌমাছির প্রতি ওহী প্রেরণের বিষয়েও মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ করেছেন,

“এবং আপনার প্রতিপালক মৌমাছিদের প্রতি ওহী করেছেন যে, পর্বতমালা ও বৃক্ষসমূহে এবং সমুচ্চ শিখরে মৌচাক নির্মাণ কর।”

নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম গণ তো বটেই, অন্যান্য মানুষও মহান আল্লাহ পাক প্রদত্ত গোপন ইঙ্গিত (নির্দেশ) উনার তাৎপর্য যথাযথভাবে উপলব্ধি ও বাস্তবায়নে সক্ষম হয়েছেন। এমনকি মৌমাছিরাও তাদের প্রতি নিক্ষেপিত তাৎপর্যপূর্ণ গোপন ইঙ্গিত (সূক্ষ্ম নির্দেশ) অনুধাবন ও বাস্তবায়নে বিচ্যূত ও বিভ্রান্ত হয়নি।

ওহী সম্পর্কে উপরে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো এজন্য যে, নুবুওওয়াত ও রিসালত দান করা হয়নি এমন মানুষ এবং মানুষ না এমন কিছুকেও মহান আল্লাহ পাক উনার তাৎপর্যময় গোপন ইচ্ছাকে ওহী নামে অভিহিত করেছেন এবং তা উপলব্ধি, বহন ও বাস্তবায়নের পরিপূর্ণ যোগ্যতা দিয়েছেন।

ওহী সম্পর্কে আলোচ্য বিষয়াদির তাৎপর্যের বিচারে মানুষ ও জিন জাতির হিদায়েতের জন্য সর্বোচ্চ মাহাত্ম ও উৎকর্ষমন্ডিত ওহী নাযিলের ক্ষেত্র হিসেবে মহান আল্লাহ পাক উনার সৃষ্ট মানবকুলের মধ্যে মনোনীত ব্যক্তিকেই নির্বাচন করেছেন। আসমানী ওহী নাযিলের এ প্রেক্ষাপটে সূরা হাশরে মহান আল্লাহ পাক বলেন,

“যদি আমি কুরআন শরীফ পর্বতের উপর নাযিল করতাম, তবে নিশ্চয়ই আপনি প্রত্যক্ষ করতেন যে, তা মহান আল্লাহ পাক উনার ভয়ে বিদীর্ণ হয়ে গেছে এবং মানুষের জন্য দৃষ্টান্তসমূহ বিবৃত করেছি যেন, তারা উপলব্ধি করে।”

ওহী নাযিলের জন্য মানুষের মধ্যে নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম গণকেই মহান আল্লাহ পাক মনোনীত করেছেন এবং উনাদের সকলের মধ্যে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই হলেন সর্বোত্তম এবং উনার মুবারক আবেহায়াত উনার উছীলায় অন্যান্য সকল নবী-রসূলগণ ওহী শ্রবণ, অনুভব, ধারণ, অনুশীলন ও বাস্তবায়নের যোগ্যতা পেয়েছেন। সমুদয় মাখলুকের কল্যাণের জন্য যোগ্যতা ও রহমতের সঞ্জীবনী উৎসের মুবারক ধারা নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথম ওহী শ্রবণে ভীত-বিহ¡ল ও বিষ্ময়াভিভূত হবেন, এমন ভাবনা একান্ত অনপোলব্ধির কারণেই আমাদের মনে উদিত হতে পারে। হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম কে দেখে এবং উনার উচ্চারিত ওহীর বাণী শুনে বিষ্ময়াভিভূত হওয়ার কারণ এ হতে পারে যে, বিষ্ময় ও বিহ¡লতা হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অন্তর মুবারকের অতল গভীর এক সহজাত বেদনাভাব, যা মহান আল্লাহ পাক উনার নিগূঢ় নৈকট্য লাভের সাথে সম্পৃক্ত। এটাও কারণ হতে পারে যে, যমীনে মহান আল্লাহ পাক উনার তাওহীদ ও আহ্কাম প্রকাশের আয়োজনে বেদানা-বিমুগ্ধ মানসিকতায় নির্বাক হয়ে থাকা। এটা নতুন করে কিছু পাবার বিস্ময় অথবা অসহনীয় বেদনাভার নয়। সৃষ্টির আদিকালে উনার সামগ্রিক সত্ত্বায় নিবিষ্ট হয়ে থাকা পরম প্রত্যাশিত নিয়ামত ও আমানতের আনুষ্ঠানিকতায় অনির্বচনীয় আনন্দ বেদনার অনুপম বহিঃপ্রকাশ। এমন বেদনা ও যন্ত্রণাকাতরতায় তিনি আক্রান্ত থেকেছেন, জাগতিক জীবন মুবারকের সামগ্রিক পরিমণ্ডলে। তাই গুনাহ না থাকা সত্ত্বেও অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য ক্ষমা ঘোষণার বিষয় আসমান ও যমীনবাসীকে জানিয়ে মহান আল্লাহ পাক যখন উনার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শান ও মর্যাদাকে নিরন্তর সমুন্নত করতে থাকেন, তখন এবং অনুক্ষণ তিনি প্রার্থনা জানান,

“হে মহান আল্লাহ পাক, যাঁরা মুক্তিপ্রাপ্ত, আযাদ আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন।”

এ প্রার্থনায় আসমান ও বিশ্ববাসী হতবাক ও বিমূঢ় হলেও সবিনয়, আনুগত্যের এ পদ্ধতি ও প্রকৃতি মহান আল্লাহ পাক উনাকে দান করেছেন, সমুদয় সৃষ্টি উৎস ভাণ্ডার হিসেবে সকলের আগে। মহান আল্লাহ পাক উনার নিগূঢ় নৈকট্যের চূড়ান্ত সীমায় উপনীত হয়েও তিনি সকাতরে বলেছেন,

“হে মহান আল্লাহ পাক, পূর্বাপেক্ষা অধিক ইল্ম যেদিন আমার অর্জিত না হয় ( মহান আল্লাহ পাক সম্পর্কে হৃদয়ে যখন নবতর সূক্ষ্ম অনুভূতির উন্মেষ না ঘটে), সেদিন যেন আপনি আমাকে পরিচিতি দান না করেন।”

সকাতর আনুগত্যের এ অবস্থা মহান আল্লাহ পাক উনারই কাম্য এবং হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও এমন বেদনা বিধুর মানসিকতায় অভ্যস্ত।

একদিন হযরত রাসূলে করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম মহান আল্লাহ পাক উনার ভয়ে ক্রন্দনরত ছিলেন। এমন সময় মহান আল্লাহ পাক ওহী পাঠালেন,

“আমি আপনাদের নির্ভয় করেছি, তবু আপনাদের ক্রন্দনের কারণ কি?” দুজনেই জবাব দিলেন, “প্রভু আমরা আপনার ইশকের রহস্য বুঝতে অক্ষম হয়ে ভয়ে জড়সড় হয়ে পড়েছি।” মহান আল্লাহ পাক উনার পক্ষ থেকে জবাব এলো, “আস্থা ভয়সংকুল অবস্থায়ই থাকুন।”

বদরের জ্বিহাদে মুসলমান পক্ষ সাময়িক চিন্তিত হয়ে পড়লে, তাৎক্ষণিকভাবে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রার্থনা জানালেন,

“হে মহান আল্লাহ পাক, আজ যদি কাফেরদের মুকাবিলায় মুসলমানগণের পরাজয় ঘটে এবং মুসলমানগণ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, তবে দুনিয়ায় আপনার ইবাদতকারী এবং নাম উচ্চারণকারী আর কেউই অবশিষ্ট থাকবেনা।”

প্রার্থনার বিষয় অবগত হয়ে হযরত আবু বকর ছিদ্দীক্ব আলাইহিস সালাম সবিনয়ে জানতে চাইলেন,

“ইয়া রাসুলাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, মুসলমানদের বিজয়ের জন্য আপনি কি মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট থেকে শপথ নিচ্ছেন? মুসলমান সেনাদলের বিজয় সম্পর্কে তিনি তো পূর্বেই আপনার সাথে ওয়াদা করেছেন।”

বদর জ্বিহাদের বিজয় সম্পর্কে নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম গণের পরে ক্বিয়ামত পর্যন্ত “যমিনের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ” হযরত আবু বকর ছিদ্দীক্ব আলাইহিস সালাম উনার ইয়াক্বীন পরিপূর্ণভাবে সঠিক ছিল। কিন্তু বিজয় বার্তার আগাম নিশ্চয়তা পেয়েও হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার, মহান আল্লাহ পাক উনার প্রতি অভ্যাসগত অনুগত প্রার্থনা জানানো ও রুজুদিল হওয়া ছাড়া বিকল্প কিছু ছিলনা।

ওহী সম্পর্কে উপরের নাতিদীর্ঘ আলোচনায় আমরা বলতে প্রয়াস পেয়েছি যে, ওহী শ্রবণ ও গ্রহণে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কোনরূপ প্রতিবন্ধকতাই ছিলনা। কারণ ওহী নাযিলের পূর্বে চল্লিশ বছর বয়স মুবারক পর্যন্ত যেমন, ঠিক তেমনি সকল সৃষ্টির পূর্বে আদিকালই তিনি ওহী ও রিসালতের যোগ্যতা প্রাপ্ত হয়েছিলেন। রিসালতপূর্ব ও রিসালত লাভোত্তর জীবন মুবারকে কোনই বিভেদ নেই, কেবল অভিন্ন ও একাকার। শুধুমাত্র সময়ের ব্যবধানে পর্যায়ক্রমে আনুষ্ঠানিকভাবে বক্ষ মুবারক উন্মোচন (সিনা মোবারক চাক), উর্দ্ধারোহণ (মি’রাজ শরীফ), নুবুওওয়াত ও রিসালত দানসহ সকল বিষয়ের সময়োচিত আয়োজন ও বহিঃপ্রকাশ মাত্র। ওহীর বাণী শ্রবণ ও গ্রহণে হাক্বীক্বী ভীত বিহ¡ল, শংকিত, বিষ্ময়াভিভূত অথবা অযোগ্য হবার প্রশ্ন উত্থাপন একজন মুমিনের জন্য কেবল অবান্তরই নয়, বিষয়টি ঈমান বিনাশের সাথেও সম্পৃক্ত।

হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম যিনি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত খাদেম, তিনি ওহী বহনের সকল পর্যায়ে ভীত-সন্ত্রস্ত থেকেছেন।

এ মর্মে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

“হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম যখন ওহী নিয়ে আমার কাছে আসতেন, তখন ভয়-ভীতিতে উনাকে কম্পমান দেখা যেতো।” (আমীন)

সূত্র : মাসিক আল বাইয়্যিনাত

বিষয় : ফাযায়িল-ফযীলত ও পবিত্রতা, পবিত্র ওহী মুবারক, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, অভিন্ন মানস মুবারক
এই বিভাগ থেকে আরও পড়ুন
« পূর্ববর্তী| সব গুলি| পরবর্তী »