আক্বায়িদু আহলিস্ সুন্নাহ ওয়াল জামায়াহ্পরিভাষিক অর্থ ও প্রাথমিক আলোচনা
উসওয়াতুন হাসানাহ | ১৬ ছফর, ১৪৩৫ হি:

মূল মাসয়ালায় যাওয়ার আগে আমরা আক্বায়িদ তথা পবিত্র ইলমুল কালাম সম্পর্কে কতিপয় প্রাসঙ্গিক জরুরী বিষয় আলোচনা করব। ইনশাআল্লাহু তা’য়ালা।

“আক্বীদাহ”- উনার শাব্দিক অর্থ:

‘আক্বীদাহ’ শব্দটি একবচন। এর বহুবচন হল ‘আক্বায়িদ’। ‘আক্বীদা’ শব্দের অর্থ: বিশ্বাস, দৃঢ় বিশ্বাস, মতাদর্শ, আক্বীদা, ঈমান, ইয়াক্বীন ইত্যাদী।

‘আক্বীদাহ’-এর পরিভাষিক অর্থ:

পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার মৌলিক ও খুঁটিনাটি সমস্ত বিষয়গুলো যা যেভাবে পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, ইজমায়ে উম্মাহ ও ছহীহ ক্বিয়াস উনার মধ্যে বর্ণিত আছে,  তা সেভাবে মনে প্রাণে সত্য বলে দৃঢ় বিশ্বাস করাকে ‘আক্বীদাহ’ বলে।

পবিত্র তাওহীদ, পবিত্র নুবুওয়াত,  রিসালাত, হযরত নবী ও রসূল আলাইহিমুস সালাম, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম, হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম, হযরত ফিরিশতা আলাইহিমুস সালাম, আসমানী কিতাব, আখিরাত, মউত, ক্ববর, হাশর, ক্বিয়ামত, হিসাব-নিকাশ, পুনরুত্থান, জান্নাত, জাহান্নাম, তাক্বদীর, হালাল, হারাম ইত্যাদী বিষয়ে পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমায়ে উম্মাহ ও ছহীহ ক্বিয়াসে যা যেভাবে বর্ণিত আছে তা সেভাবেই দৃঢ় বিশ্বাস করা ও মনে-প্রাণে অকাট্যভাবে সত্যায়ন করা প্রত্যেক মুমিন-মুসলমান মানুষ ও জ্বিন উনাদের জন্য ফরযে আইন। পবিত্র আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত উনার বর্ননা ও ফায়সালা উনার বিপরীত ধারণা পোষণ করা বা মন্তব্য করা কাট্টা কুফরী। পবিত্র আক্বীদাহ-পবিত্র ঈমান-ইয়াক্বীন পরিশুদ্ধ না হলে মানুষের কোন আমল-ই মহান আল্লাহ পাক উনার কাছে কবূল হয় না। তাই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত উনার প্রদর্শিত মাসয়ালা মুতাবিক আক্বীদাহ (তথা পবিত্র ঈমান বা ইয়াক্বীন) পরিশুদ্ধ করা প্রত্যেক নর ও নারীর জন্য ফরযে আইনের অন্তর্ভূক্ত।

‘ইলমুল কালাম’- উনার শাব্দিক অর্থ:

‘ইলমুন’ অর্থ: জ্ঞান, ইলম, আক্বল, সমঝ, বিবেক ইত্যাদী। ‘আল কালাম’ অর্থ: কথা, কথপোকথন, যৌক্তিক আলোচনা ইত্যাদী। একসাথে ‘ইলমুল কালাম’ অর্থ: যৌক্তিক ইলম, বাক্যালাপের জ্ঞান, কথপোকথনের ইলম ইত্যাদী।

‘ইলমুল কালাম’- উনার পারিভাষিক অর্থ:

পবিত্র শরীয়ত উনার পরিভাষায় ‘ইলমুল কালাম’ এমন এক প্রকার পবিত্র ইলম বা জ্ঞানের নাম যা দ্বারা পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমায়ে উম্মাহ ও ছহীহ ক্বিয়াস উনার অকাট্য দলীল প্রমাণাদীর মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে সর্বপ্রকার সন্দেহ-সংশয় নিরসনের মাধ্যমে ‘আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত’ উনার আক্বায়িদ সাব্যস্ত করা হয়।

মূলতঃ ‘ইলমুল আক্বায়িদ’, ইলমুল ইয়াক্বীন’, ইলমুল ঈমান’, ইলমুত তাছদীক্ব’কেও ‘ইলমুল কালাম’ বলা হয়। কারণ, ‘ইলমুল কালাম’ উনার মূল উদ্দেশ্য হলো বিশুদ্ধ আক্বায়িদ, ইয়াক্বীন, ঈমান, তাছদীক্ব বিশুদ্ধভাবে অন্তরে প্রতিষ্ঠিত করা।

ইলমুল কালাম পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার বুনিয়াদ:

‘ইলমুল কালাম’ বা আক্বায়িদ সম্পর্কিত পবিত্র ইলম সমস্ত ইলমের মূল বুনিয়াদ বা খুঁটি। কারণ, ইলমুল কালাম উনার মাধ্যমে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জাত বা সত্তা ও ছিফাত বা গুনাবলীর ইলম দলীল-আদিল্লা’র মাধ্যমে অর্জিত হয়। এ বিষয়টি অতীব গুরুত্বের সাথে সকলের জানার দরকার যে, মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জাত ও ছিফাত সম্পর্কে যতক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ জ্ঞান অর্জিত না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত নবী ও রসূল আলাইহিমুস সালাম, পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র সুন্নাহ শরীফ, এবং ফিক্বাহ শাস্ত্র ও উনাদের শাখাগত বিষয় সম্পর্কে পুর্নজ্ঞান অর্জিত হতে পারে না। তাই সমস্ত ইলমের মূল বুনিয়াদ হচ্ছে ইলমুল আক্বায়িদ তথা ইলমুল কালাম। ‘ইলমুল কালাম’ সম্পর্কিত পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জন না করলে আক্বীদা বা ঈমান পরিশুদ্ধ হওয়া অসম্ভব। আর আক্বীদাহ পরিশুদ্ধ না হলে মু’মিন ও মুসলমান হওয়া যাবে না। আর এর ফলস্বরূপ মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট কোন আমল-ই গ্রহণযোগ্য হবে না।

‘ইলমুল কালাম’ উনার আলোচ্য বিষয়:

‘ইলমুল কালাম’ বা আক্বায়িদী জ্ঞানের আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে তিনটি মতামত পরিলক্ষিত হয়। যথা:

১। অধিকাংশ উলামায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ উনাদের মতে ‘ইলমুল কালাম’ উনার আলোচ্য বিষয় হল ‘মালূম’ বা জ্ঞাত বিষয়। এ হিসেবে যে, এর সাথে দীনী আক্বায়িদ প্রমাণ করার নিকটবর্তী বা দূরবর্তী সম্পর্ক রয়েছে।

২। হযরত কাযী আরমাভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মতে-ইলমুল কালাম উনার আলোচ্য বিষয় হল, ‘যাতুন লিল্লাহ’ বা মহান আল্লাহ পাক উনার সত্তা। কেননা ‘ইলমুল কালাম’ শাস্ত্রে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার সত্তাগত গুনাবলী সম্পর্কে এবং মহান আল্লাহ তায়ালা উনার ইহ ও পরকালীন কার্যাবলী ও আহকাম সম্পর্কে আলোচনা করা হয়।

৩। হযরত ইমাম গাযযালী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মতে ‘ইলমুল কালাম’-উনার আলোচ্য বিষয় হল, ‘আশশাইউল মাওজূদ’ বা বিদ্যমান কিছু। এ হিসেবে যে, এর সাথে দীনী আক্বায়িদ প্রমাণ করার সম্পর্ক রয়েছে।

‘ইলমুল কালাম’ উনার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য:

‘ইলমুল কালাম’-উনার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে: ‘আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত’- উনার আক্বীদাহ অনুযায়ী আক্বায়িদের বিষয় (মাসয়ালা)গুলো দলীল-প্রমাণ দ্বারা হক্ব বলে ছাবিত করা। বাতিল ৭২টি ফিরক্বার অযৌক্তিক ও খোঁড়া দলীলগুলোকে খন্ডন করা। মানুষকে সঠিক আক্বায়িদ সম্পর্কে বিশুদ্ধ জ্ঞান দান করা। আর সঠিক আক্বায়িদ অনুযায়ী নিজের ঈমানকে মুনাফিকী, কুফরী ও শিরকী থেকে এবং আমলকে ফাসিকী থেকে হিফাযত করা।

পবিত্র ইলমুল কালাম উনার উপর সম্মানিত শরীয়ত উনার সমস্ত আহকামগুলো নির্ভরশীল। ইলমুল কালাম বা ইলমুল আক্বায়িদের উপর পূর্ণ দখল না থাকলে শরয়ী মাসয়ালা নির্ণয় ও ফতওয়া প্রদাণের সময় ভূল-ত্রুটি থেকে বেঁচে থাকা মোটেই সম্ভব হয়ে উঠে না।

‘ইলমুলা কালাম’ এর প্রকারভেদ:

‘ইলমুল কালাম’ দু’প্রকার। যথা

১। ‘কালামুল ক্বুদামা বা প্রাচীন ইলমুল কালাম।

২। ‘কালামুল মুতায়াখখিরীন’ বা পরবর্তীগণের রচিত ইলমুল কালাম।

১. কালামুল ক্বুদামা

যে সমস্ত কিতাবের দ্বারা দর্শনের সংমিশ্রন ব্যতীত শুধু পবিত্র কুরআন শরীফ, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমায়ে উম্মাহ্ ও পবিত্র ছহীহ ক্বিয়াস থেকে দলীল প্রমানাদীর আলোকে দীনী আক্বায়িদ জানা যায়, তাকে ‘কালামুল কুদামা’ বা প্রাচীন ইলমুল কালাম বলে। ‘কালামুল কুদামা’ সম্পর্কে বহু কিতাব রচিত হয়েছে। যেমন:

(ক) আল ইমামুল আ’যম হযরত আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি কর্তৃক লিখিত ‘আল ফিক্বহুল আকবর’।

(খ) হযরত মুল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার লিখিত ‘শরহুল ফিক্বহিল আকবর’।

(গ) হযরত আল্লামা আবূ জা’ফর ত্বাহাবী হানাফী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার লেখা ‘আক্বীদাতুত্ ত্বাহাবী’।

(ঘ) হযরত আল্লামা নাসাফী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার লিখিত ‘বাহরুল কালাম’।

(ঙ) আল্লামা আবূ মাশকূর সুলামী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ‘কিতাবুত তাওহীদ’।

২. কালামুল মুতায়াখ্খিরীন

যে সমস্ত কিতাবের দ্বারা দর্শনের সংমিশ্রনসহ নক্বলী ও আক্বলী দলীল-প্রমানাদীর আলোকে দীনী আক্বায়িদ জানা যায়, তাকে কালামুল মুতায়াখখিরীন বা পরবর্তীগণের রচিত ইলমুল কালাম বলে। কালামুল মুতায়াখ্খিরীন সম্পর্কে অনেক কিতাব রচিত হয়েছে। যেমনঃ

(ক) হযরত কাযী আযদুদ্দীন আব্দুর রহমান ইবনে আহমদ রহমতুল্লাহি আলাইহি কর্তৃক লিখিত ‘আল মাওয়াক্বিফ’।

(খ) আল্লামা কাযী বাইযাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার লিখিত ‘তাওয়াবি’ ও ‘তাহযীব’।

(গ) আল্লামা আবূ হাফ্স উমর নাসাফী হানাফী রহমতুল্লাহি আলাইহি কর্তৃক লিখিত ’আল আক্কায়িদুন নাসাফিয়্যাহ’।

(ঘ) আল্লামা সা’দুদ্দীন তাফতাযানী শাফিয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার লিখিত শরহুল আক্বায়িদিন্ নাসাফিয়্যাহ, আল্ মাক্বাছিদ ও শরহুল মাক্বাছিদ।

(ঙ) আল্লামা সাইফুদ্দীন আমিদী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কিতাব।

(চ) আল্লামা ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কিতাব।

কতিপয় জরুরী পরিভাষা :

পবিত্র ঈমান : ইমামে আ’যম হযরত আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি ও ইমাম হযরত আবূ মানছূর মাতুরীদী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মতে, অর্থাৎ শুধু আন্তরিক বিশ্বাসই পবিত্র ঈমান। (শরহে মাওয়াক্বিফ, আল আক্বায়িদুন নাসাফিয়্যাহ)। কিন্তু মৌখিক স্বীকৃতি দুনিয়াবী ফায়দা অর্জনের জন্য শর্ত। আর রুকনগুলোর উপর আমল করা মু’মিনে কামিল ও মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ। অর্থাৎ সাইয়িদুল মুরসালীন ইমামুল মুরসালীন খতামুন্ নাবিয়্যীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট হতে যা কিছু নিয়ে এসেছেন তা আন্তরিকভাবে দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাস করাকে পবিত্র ঈমান বলে। আর বিশ্বাসীকে মু’মিন বলে।

পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার শাব্দিক অর্থ: ইসলামুন শব্দটি বাবে ইফয়ালুন এর মাছদার বা ক্রিয়ামূল। সালমুন মাদ্দাহ বা মূল ধাতু থেকে নিষ্পন্ন। এর শাব্দিক অর্থ অনুগত হওয়া, আত্ম সমর্পন করা, নিরাপত্তা দান, শিরধার্য কারা, বিনয় প্রকাশ করা, আনুগত্যতার সাথে আত্ম সমর্পন করা, শান্তি, ইত্তিবা, ইসলাম পালন করা ইত্যাদি।

পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার পারিভাষিক অর্থ: আল্লামা সা’দুদ্দীন মাসউদ তাফতাযানী শাফিয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি ‘আল আক্বায়িদুন নাসাফিয়্যাহ’-এর শরাহ ‘শরহুল আক্বায়িদিন্ নাসাফিয়্যাহ’ কিতাবের ১২৮ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, “পবিত্র দ্বীন ইসলাম হলো যাবতীয় বিধান গ্রহনার্থে ও ঐগুলোর প্রতি আনুগত্য স্থাপন উদ্দেশ্য মহান আল্লাহ পাক ও উনার রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কাছে বশ্যতা স্বীকার করা।”

আদ্ দুররুল মুখতার শরহু তানবীরিল আবছার নামক বিশ্ব বিখ্যাত ফতওয়ার কিতাবে বর্ণিত আছে, “পবিত্র দ্বীন ইসলাম হচ্ছে; সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন সাইয়িদুনা, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার কাছ থেকে যা কিছু নিয়ে এসেছেন বলে জানা গেছে ঐসব কিছুর প্রতি তাছদীক্ব বা বিশ্বাস স্থাপন করা বা মেনে নেয়া।”

 লিসানুল আরব ও আল্ মু’জামুল ওয়াসীত্ব নামক অভিধানের কিতাবে উল্লেখ আছে, “পবিত্র দ্বীন ইসলাম হচ্ছে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন খতামুন নাবিয়্যীন হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা কিছু নিয়ে এসেছেন তার প্রতি বিনয় প্রকাশ করা ও তা আনুগত্যতার সাথে গ্রহণ করা।”

মূল কথা হল: মহান আল্লাহ পাক উনার তরফ থেকে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন নাবিয়্যীন রহমতুল্লিল আলামীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট ওহীর মাধ্যমে নাযিলকৃত পুর্নাঙ্গ জীবন ব্যবস্থাকে ইসলাম বলা হয়। আর যিনি ইসলাম কে আভ্যন্তরীন ও বাহ্যিক ভাবে মেনে নেন উনাকে মুসলিম বলা হয়।

দ্বীন-উনার শাব্দিক অর্থ: ‘দীনুন’ শব্দটি বাবে ‘দ্বারাবা’ এর মাছদার বা ক্রিয়ামুল। শব্দটি একবচন, উনার বহুবচন ‘আদ্ ইয়ানুন’। এর শাব্দিক অর্থ দ্বীন, পবিত্র ইসলাম, ধর্ম বিশ্বাস, ধার্মিকতা, দ্বীনদারি, বিচার, প্রতিদান, আনুগত্য, ধর্ম পয়ায়ণতা, চরিত্র, অভ্যাস, অবস্থা, রক্ষনশীলতা, ক্ষমতা, ফয়সালা, পরিনাম বিবেচনা করে উপায় উদ্ভাবন করা ইত্যাদী।

দ্বীন উনার পারিভাষিক অর্থ: আল্ মু’জামুল ওয়াসীত্ব নামক অভিধানের কিতাবে উল্লেখ আছে, “দ্বীন হচ্ছে-আন্তরিক বিশ্বাস, মৈখিক স্বীকৃতি এবং অঙ্গ প্রতঙ্গ দ্বারা রুকনসমূহের আমল করা।

পবিত্র ঈমান, পবিত্র ইসলাম ও পবিত্র দ্বীন-উনারর মধ্যে সম্পর্ক: জুমহুর বা অধিকাংশ উলামায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের মতে ‘পবিত্র ঈমান’ ‘পবিত্র ইসলাম’ ‘পবিত্র দ্বীন’ এ তিনটি শব্দে শুধু শাব্দিক পার্থক্য রয়েছে। পারিভাষিক, ব্যবহারিক বা শরয়ী অর্থে কোন পার্থক্য নেই।

ইহসান উনার শাব্দিক অর্থ: ইহসানুন শব্দটি হুসনুন শব্দ থেকে নিষ্পন। এর শাব্দিক অর্থ সৎ কর্ম করা, সদ্ব্যবহার করা, নিষ্ঠার সাথে কাজ করা, ইখলাছ, একাগ্রতা, অনুগ্রহ, দান, বদান্যতা, পরোপকার, কল্যাণ, সুসম্পাদন, তাছাউফ, ত্বরীক্বত ইত্যাদী।

ইহসান-উনার পারিভাষিক অর্থ: শরীয়তের পরিভাষায় ‘আনুগত্য ও বিনয় নম্রতার সাথে ইবাদতে ইখলাছ (একানিষ্ঠতা) পয়দা করাকে ইহ্সান বলে। আর যিনি ইহসান বা তাছাউফ হাছিল করেন উনাকে মুহসিন বা মুতাছাব্বিক তথা ওলীআল্লাহ বলে।

শিরক-এর শাব্দিক অর্থ: শব্দটির অর্থ; পবিত্র ঈমান ও পবিত্র ইবাদতে অংশীদারকরণ, বহু মা’বূদে বিশ্বাস , শরীক করা, অংশীদার বানানো, অংশী স্থাপন করা ইত্যাদি।

শিরক-এর পারিভাষিক অর্থ: মহান আল্লাহ পাক উনার জাত পাক (সত্ত্বা মুবারক) ও ‘ছিফাত (গুণাবলী মুবারক) উনার সাথে অন্য কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করাকে শিরক বা অংশীদারিত্ব বলে।’ আর যে শিরক করে তাকে মুশরিক বা অংশীদার সাব্যস্তকারী বলে।

কুফর-এর শাব্দিক অর্থ: কুফরুন শব্দের অর্থ অস্বীকার করা গোপন করা, ঢেকে রাখা, উল্টে দেয়া, কুফর, কুফরী, অবিশ্বাস, অকৃতজ্ঞতা ইত্যাদি।

কুফর-এর পারিভাষিক অর্থ: শরীয়তের পরিভাষায় ঈমান বা আক্বায়িদের বিষয়গুলো ও পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার যাবতীয় হুকুম-আহকাম (বিধি-বিধান) অবিশ্বাস করা, তুচ্ছ জানা অথবা অস্বীকার করাকে কুফর বলে। আর যে কুফরী করে তাকে কাফির বলে। কুফর পবিত্র ঈমান উনার বিপরীত।

তাওহীদ-উনার শাব্দিক অর্থ: তাওহীদ শব্দটির শাব্দিক অর্থ: মহান আল্লাহ পাক উনার একত্ব, একত্ববাদ, তাওহীদ ইত্যাদী।

তাওহীদ-উনার পারিভাষিক অর্থ: মহান আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন উনাকে সকল ক্ষমতা ও ইবাদত উনার একমাত্র মালিক হিসেবে মনে প্রাণে বিশ্বাস করাকে তাওহীদ বলে। তাওহীদের বাক্য হচ্ছে, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক ছাড়া কোন মা’বুদ নেই।

পবিত্র নুবুওয়াত মুবারক: মহান আল্লাহ পাক হযরত নবী আলাইহিমুস্ সালামগণ  উনাদেরকে যে নিয়ামত মুবারক দান করেছেন তাকে ‘নুবুওওয়াত’ বলে।

রিসালাত মুবারক: মহান আল্লাহ পাক হযরত রসূল আলাইহিমুছ ছলাতু ওয়াস্ সালামগন উনাদেরকে যে নিয়ামত মুবারক দান করেছেন তাকে ‘রিসালাত’ বলে।

নবীঃ ‘নাবিউন’ অর্থঃ সংবাদদানকারী, প্রেরীত, গাইব বা অদৃশ্যের সংবাদদাতা, নবী, পয়গম্বর ইত্যাদি। যাঁদের সাথে হযরত জিবরাঈল আলাইহিস্ সালাম সাক্ষাৎ করেননি, উনাদেরকে নবী বলে। উনাদের সংখ্যা অনির্দিষ্ট।

রসূলঃ ‘রসূলুন’ অর্থঃ প্রেরীত, গাইব বা অদৃশ্যের সংবাদদাতা, প্রতিনিধি, বার্তাবাহক, সংবাদদানকারী, পয়গম্বর, রসূল ইত্যাদি। “যাঁদের সাথে হযরত জিবরাঈল আলাইহিস্ সালাম সাক্ষাৎ করেছেন, উনাদেরকে রসূল বলে। উনাদের সংখ্যা ৩১৩ ‘তিনশত তের’ থেকে ৩১৫ ‘তিনশত পনের’ জন।

সূত্র : মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ

বিষয় : আক্বায়িদু আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াহ,
এই বিভাগ থেকে আরও পড়ুন
« পূর্ববর্তী| সব গুলি| পরবর্তী »