ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার সংক্ষিপ্ত সাওয়ানেহে উমরী মুবারক
উসওয়াতুন হাসানাহ | ৫ শা’বান, ১৪৩৫ হি:

খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার আখাছছুল খাছ মনোনীত ব্যক্তিত্বগণ উনাদের মধ্যে ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম তিনি অন্যতম। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সাইয়্যিদুশ শুহাদা হযরত ইমামুছ ছালিছ আলাইহিস সালাম তিনি নূরে মুজসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত এবং পূত-পবিত্র হযরত আহলু বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের মধ্যে বিশেষ ব্যক্তিত্ব। উনার ফাযায়িল-ফযীলত এবং খুছুছিয়াত মুবারক সম্পর্কে পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ এবং পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মাঝে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। উনার মুবারক শানে হুসনে যন পোষণের ব্যাপারে রয়েছে অত্যধিক তাক্বীদ। পবিত্র শা’বান মাস হলো উনার পবিত্র বিলাদত শরীফ গ্রহণের মাস। সঙ্গতকারণেই এ মাসে উনার সাওয়ানেহে উমরী মুবারক আলোচনা-পর্যালোচনা করা অতীব প্রয়োজন। আর এ কারণেই সংক্ষিপ্তাকারে উনার সাওয়ানেহে উমরী মুবারক আলোচনা করা হলো।


পবিত্র বিলাদত শরীফ
সাইয়্যিদুশ শুহাদা, সাইয়্যিদুনা ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি চতুর্থ হিজরী সনের পবিত্র শা’বান মাস উনার ৫ তারিখ ইয়াওমুল জুমুয়াতি বা জুমুয়াবার বা’দ আছর সম্মানিত ও মহাপবিত্র মদীনা শরীফ শহরে পবিত্র বিলাদত শরীফ গ্রহণ করেন। পবিত্র বিলাদত শরীফ গ্রহণ করার পর স্বয়ং নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনার কান মুবারক-এ আযান মুবারক ও ইকামত মুবারক দিয়ে উনার জন্য দুআ’ মুবারক করেন। আপন হাত মুবারকে উনার তাহনীক মুবারক করেন। উল্লেখ্য যে, সাইয়্যিদাতু নিসায়ি আহলিল জান্নাহ হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম তিনি সেদিন যথারীতি পবিত্র আছর নামায আদায় করেন। বা’দ আছর হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র বিলাদত শরীফ গ্রহণ করেন। অতঃপর হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম তিনি পবিত্র মাগরীব নামায আদায় করেন। উনাকে মাজুর অবস্থা অতিবাহিত করতে হয়নি। (সুবহানাল্লাহ)


পবিত্র হুলিয়া মুবারক
ইমামুল আউওয়াল হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, কোনো ব্যক্তি যদি পবিত্র মাথা মুবারক থেকে পবিত্র ছিনা মুবারক পর্যন্ত নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে পুরোপুরি সদৃশ কাউকে দেখে আনন্দিত হতে চায়, সে যেন সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছানী মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে দেখে নেয়। আর কোনো ব্যক্তি যদি পবিত্র ছিনা মুবারক থেকে পবিত্র ক্বদম মুবারক পর্যন্ত নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পুরোপুরি সদৃশ কাউকে দেখে আনন্দিত হতে চায়, সে যেন হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে দেখে নেয়।
অর্থাৎ সাইয়্যিদুনা ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ছিলেন নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পুরোপুরি নকশা মুবারক। সুবহানাল্লাহ
পবিত্র আকীক্বা মুবারক ও নাম মুবারক
পবিত্র বিলাদত শরীফ গ্রহণের সাতদিন পর অর্থাৎ বারোই শা’বান শরীফ স্বয়ং নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আকীক্বা মুবারক সম্পাদন করেন। আর তিনি উনার নাম মুবারক রাখেন হযরত ইমাম ‘হুসাইন’ আলাইহিস সালাম। পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে- “সাইয়্যিদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হাসান আলাইহিস সালাম উনার ও সাইয়্যিদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনারা জান্নাতী নাম মুবারকসমূহ হতে দুখানা নাম মুবারক।” উনাদের পূর্বে আরবের জাহিলিয়াত যুগে এ দু’নাম মুবারক প্রচলিত ছিলো না। উনার কুনিয়াত মুবারক হলো হযরত আবু আব্দিল্লাহ আলাইহিস সালাম।
হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত ইমামুছ ছানী মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের আকীক্বা মুবারক করার জন্য দুটি করে দুম্বা জবাই করেন।

শৈশব কাল মুবারক
সাইয়্যিদুশ শুহাদা, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন। তিনি উনাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দায়েমী ছোহবত মুবারক এবং পৃষ্ঠপোষকতা মুবারকে হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বেড়ে উঠেন। যা বিভিন্ন পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মাঝে ইরশাদ মুবারক হয়েছে। যেমন, হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি একদা এমন অবস্থায় বাহিরে তাশরীফ আনলেন যে, উনার এক কাঁধ মুবারক উনার উপর ইমামুছ ছানী মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ইমাম হাসান আলাইহিস সালাম উনাকে এবং অন্য কাঁধ মুবারক উনার উপর ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনাকে বসিয়ে ছিলেন। সুবহানাল্লাহ!

হাবীবী কুরবানী মুবারক উনার ফলাফল:
আল্লামা হযরত জামী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বর্ণনা করেন, একদিন নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে ডান পার্শ¦ মুবারকে ও স্বীয় লখতে জিগার আওলাদ হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনাকে বাম পার্শ¦ মুবারকে বসিয়েছিলেন। এমতাবস্থায় হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি উপস্থিত হয়ে আরজ করলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! মহান আল্লাহ তায়ালা তিনি উনাদের মধ্য থেকে একজনকে উনার সাক্ষাৎ মুবারক-এ নিতে চান। অতএব, আপনি উনাদের দু’জনের মধ্যে যাঁকে ইচ্ছা সাথে রাখুন আর যাঁকে ইচ্ছা উনাকে মহান আল্লাহ পাক উনার সাক্ষাৎ মুবারক-এ যেতে অনুমতি দিন। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যদি মহান আল্লাহ পাক উনার সাক্ষাতে যান, তাহলে উনার বিরহে হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম উনার খুবই কষ্ট হবে। হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনারাও খুবই কষ্ট হবে। আর উনাদের কষ্টের কারণে আমারও অনেক কষ্ট হবে। আর সাইয়্যিদুনা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তিনি যদি মহান আল্লাহ পাক উনার মহান সাক্ষাতে চলে যান, তাহলে একমাত্র আমিই দুঃখ পাবো। আমি চাই- আমি একাই কষ্ট করি। হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম এবং হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনাদের যেন কোনো কষ্ট না হয়। এজন্য নিজে দুঃখ পাওয়াটাই আমি পছন্দ করি। 

এ ঘটনার তিনদিন পর সাইয়্যিদুনা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তিনি পবিত্র বিছাল শরীফ গ্রহণ করেন। এরপর থেকে যখনই সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সমীপে আসতেন, তখন তিনি উনাকে মুবারকবাদ দিতেন এবং উনার কপাল মুবারক-এ বুছা দিতেন এবং উপস্থিত হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকে সম্বোধন করে বলতেন, “আমি হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জন্য আপন আওলাদ হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনাকে কুরবানী দিয়েছি।” সুবহানাল্লাহ! (শাওয়াহিদুন নুবুওওয়াত)

পবিত্র ইলম মুবারক চর্চার আনুষ্ঠানিকতা:
সাইয়্যিদুনা ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাইয়্যিদু শাবাবী আহলিল জান্নাহ হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার কর্তৃক পূর্ব মনোনীত। যাবতীয় নাজ নিয়ামত উনার সংস্পর্শ মুবারকে ধন্য হয়েছে। সঙ্গতকারণে তিনি যাবতীয় ইলমসহই তাশরীফ মুবারক গ্রহণ করেছেন। তথাপি বিষয়টি উম্মাহকে শিক্ষা দিতে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ইলম চর্চা করেছেন। যার বহু প্রমাণ পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে। যেমন, পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে যে, একদা সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছানী মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনারা দুখানা কাগজে কিছু বিষয় লিপিবদ্ধ করলেন। অতঃপর উনারা আম্মাজান হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম উনার নিকট অধিক সুন্দর লিখা নির্ধারণের আরজি জানালেন। হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম তিনি বললেন যে, আপনাদের প্রশ্নের জবাব দিবেন আপনাদের পিতা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি। আপনারা উনার নিকট গমন করুন। তখন উনারা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার নিকট গমন করলেন এবং সেই একই বিষয়ে আরজি জানালেন। হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি বললেন যে, আপনাদের কার লেখা বেশি সুন্দর তা নির্ধারণ করবেন আপনাদের নানাজান তিনি। উনারা তখন নানাজান নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট গিয়ে উনাদের আরজি মুবারক পুনরাবৃত্তি করলেন।

তখন নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি একখানা আপেল মুবারক নিয়ে বললেন, এই আপেলখানা উপর থেকে নিক্ষেপ করা হবে। ইহা যাঁর লিখা মুবারক উনার উপর পতিত হবে উনার লিখা মুবারক অতি সুন্দর বলে নির্ধারিত হবে। অতঃপর হাতের লিখা মুবারক উনার কাগজ মুবারক দুটির উপরে আপেলটি নিক্ষপ করা হলো। সাথে সাথে কুদরত মুবারক জাহির হলো। আপেল ফলটি দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে মুবারক কাগজ দুটির উপর পড়ে গেল। সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছানী মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের উভয়ের লেখা মুবারক অতিসুন্দর বলে প্রমাণিত হলো। সুবহানাল্লাহ!
মূলত বর্ণিত ওয়াকিয়া মুবারক দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, হযরত ইমামুছ ছালিছ আলাইহিস সালাম তিনি স্বীয় পিতা-মাতা আলাইহিমাস সালাম উনাদের এবং নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম উনার নিকট ইলম মুবারক চর্চার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছেন।


পবিত্র আখিরী চাহার শোম্বা শরীফ উনার মেহমান
পবিত্র বিদায় হজ্জ হতে ফিরে এসে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি জিসমানী অসুস্থতার শান মুবারক গ্রহণ করেন। আর এই শান মুবারক দীর্ঘদিন পর্যন্ত জাহির করে পবিত্র সফর শরীফ মাস উনার শেষ বুধবার শারীরিক সুস্থতার শান মান মুবারক গ্রহণ করেন। সকাল বেলা গোসল মুবারক করেন। হযরত উম্মুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম, হযরত আহলু বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম এবং হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের নিকট সংবাদ পাঠান এবং দীদার মুবারক হাদিয়া করেন। এ দিনটি আখিরী চাহার শোম্বা শরীফ নামে মুসলিম জাহানে মশহুর।
এই মুবারক দিনে সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছানী মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনারা আপন নানাজান ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আখাছ্ছুল খাছ দাওয়াত ও দীদার মুবারক লাভ করেন। এমনকি নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদেরকে নিজ হাত মুবারকে খাইয়ে দেন। পরম স্নেহ-মমতায় অজস্রবার কোলে তুলে নেন। বারবার বুছা মুবারক প্রদান করেন। 

আনুষ্ঠানিকভাবে হাবীবী নিয়ামত মুবারক লাভ
হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি মালিকে আনআম হিসেবেই পবিত্র বিলাদত শরীফ গ্রহণ করেন। তথাপি উনার বেমেছাল শান মুবারক জানান দেয়ার জন্য মহান আল্লাহ পাক তিনি বিশেষ বিশেষ ওয়াকিয়া মুবারক সংঘটিত করেছেন। যা দ্বারা কেবল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। তেমনিভাবে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে হাবীবী নিয়ামত মুবারক লাভ করেন।

সাইয়্যিদাতু নিসায়ি আহলিল জান্নাহ হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম উনার থেকে ইরশাদ মুবারক হয়েছে। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বিদায় গ্রহণের পূর্বে উনার নিকট হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম তিনি হযরত ইমামুছ ছানী মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে এবং হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদেরকে নিয়ে আসলেন এবং বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! উনাদেরকে বিশেষ হাদিয়া মুবারক প্রদান করুন। তখন নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করলেন যে, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছানী মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জন্য আমার প্রভাব প্রতিপত্তি ও নেতৃত্ব মুবারক। আর সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জন্য আমার বীরত্ব ও দানশীলতা মুবারক। অপর বর্ণনায় এসেছে, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছানী মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জন্য আমার দৃঢ়তা ও নেতৃত্ব মুবারক। আর সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জন্য আমার শক্তি ও দানশীলতা মুবারক। (তাবরানী)


সম্মানিত নানাজান উনার সুমহান বিছাল শরীফ পরবর্তী সময়
নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র বিছাল শরীফ গ্রহণ করার পর হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম তিনি ছয় মাস দুনিয়ার যমীনে অবস্থান করেন। এ সময়ে হাবীবী বিরহে তিনি বিভোর হয়ে সময় অতিবাহিত করেন। সর্বদা রওজা শরীফ উনার নিকট অবস্থান করতেন। আর সেই সময়ে হযরত ইমামুছ ছালিছ আলাইহিস সালাম তিনি পিতা ও বড় ভাই উনাদের সাথে একত্রিত হয়ে উনার আম্মাজান আলাইহাস সালাম উনার খিদমত মুবারক উনার আঞ্জাম দেন। যদিও তিনি দুনিয়াবী দৃষ্টিতে তখন মাত্র সাড়ে ছয় বৎসরের বালক। 
অপরদিকে সেই সময়ে হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম তিনি সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছানী মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে এবং সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদেরকে দেখে দেখে চক্ষু মুবারক শীতল করতেন। হাবীবী বিরহের যন্ত্রণা লাঘবের প্রচেষ্টা চালাতেন। কারণ উনারা ছিলেন পুরোপুরিভাবে নকশায়ে হাবীবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। 

প্রথম খলীফা উনার খিলাফতকালে
আফদ্বালুন নাস বা’দাল আম্বিয়া হযরত ছিদ্দীক্বে আকবর আলাইহিস সালাম উনার খিলাফতকালের প্রথম ছয় মাস সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছানী মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনি এবং সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনারা হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম উনার খিদমত মুবারকের আঞ্জাম দেয়ার কারণে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করেন। যার কারণে খলীফা উনার প্রতি মনোনিবেশ করার ফুরসত উনারা পাননি। অতঃপর হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম তিনি পবিত্র বিছাল মুবারক গ্রহণ করার পর হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি হযরত ইমামুছ ছানী মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি, এবং হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনিসহ সম্মানিত খলীফা উনার বাইয়াত মুবারক গ্রহণ করেন এবং খিলাফত উনার বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেন। 

দ্বিতীয় খলীফা উনার খিলাফতকালে
আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার খিলাফতকালে হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র হাদীছ শরীফ, তাফসীর, ফিক্বাহ উনাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। যদিও উনার দুনিয়াবী বয়স মুবারক অল্প ছিলো। উনার পৃষ্ঠপোষকতা মুবারকে রঈসুল মুফাসসির হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুসহ অনেক মশহুর ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠেন। আর এই সময়ে স্বয়ং খলীফা উনাকে গোলামীয়ত প্রদানের ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়। 

তৃতীয় খলীফা উনার খিলাফতকালে
আমীরুল মু’মিনীন হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম উনার খিলাফতকালে হযরত ইমামুছ ছালিছ আলাইহিস সালাম তিনি খিলাফত উনার গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দায়িত্ব পরিচালনার পাশাপাশি দরস-তাদরীসের ব্যাপক আঞ্জাম দেন। এমনকি হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম উনার প্রতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে তিনি কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। বর্ণিত আছে, সেই সময়ে তিনি স্বয়ং নিজে খলীফা উনার হুজরা শরীফ উনার নিরাপত্তা প্রদানের নিমিত্তে টানা কয়েক দিন অবস্থান মুবারক গ্রহণ করেন। 

পবিত্র শাদী মুবারক
ঐতিহাসিকগণের বর্ণনা অনুযায়ী, সাইয়্যিদু শাবাবি আহলিল জান্নাহ, হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দু’জন আহলিয়া আলাইহিমাস সালাম ছিলেন। উনারা হলেন হযরত লাইলা বিনতে মুররা আলাইহাস সালাম ও হযরত শহরবানু আলাইহাস সালাম। হযরত লাইলা বিনতে মুররা আলাইহাস সালাম উনার রেহেম শরীফে তাশরীফ মুবারক গ্রহণ করেন হযরত আলী আকবর আলাইহিস সালাম। তিনি কারবালার প্রান্তরে শাহাদাত মুবারক গ্রহণ করেন। হযরত শহরবানু আলাইহাস সালাম উনার শাদী মুবারক নিয়ে ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে।

‘তাহযীবুল কামাল’ কিতাবে উল্লেখ করা হয় যে, খলীফাতুল মুসলিমীন, আমীরুল মু’মিনীন হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার খিলাফতকালে দিকে দিকে পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার বিজয় প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই বিজয় অভিযানসমূহের ধারাবাহিকতায় ২১ হিজরীতে হযরত আহনাফ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার সেনাপতিত্বে পারস্য ও চীন সম্রাটের সম্মিলিত বাহিনীর সাথে তুমুল জিহাদ সংঘটিত হয়। ওই পবিত্র জিহাদেও মহান আল্লাহ পাক তিনি মুসলিম বাহিনীকে প্রকাশ্য বিজয় হাদিয়া করেন। পারস্য সম্রাট ইয়াজদগির্দ নিহত হয়। তার বিপুল পরিমাণ সম্পদ গনিমত হিসেবে লাভ হয়। তাছাড়া সম্রাটের তিন কুমারী কন্যা যুদ্ধবন্দি হন। পবিত্র জিহাদ শেষে যাবতীয় গনিমত ও যুদ্ধবন্দিদেরকে খলীফা উনার নিকট প্রেরণ করা হয়।

পবিত্র ইসলামী শরীয়ত উনার নিয়ম অনুযায়ী গনিমতের ফায়সালা করা হয়। কিন্তু রাজকন্যা তিনজন উনাদের ব্যাপারে চূড়ান্ত ফায়সালা করা সম্ভব হয়নি। পরিশেষে উনাদের ব্যাপারে মজলিসুশ শুরা আহবান করা হয়। অনেক আলোচনা হয়। এক পর্যায়ে হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, উনারা শ্রেষ্ঠ খান্দানের মেয়ে। উনাদের সাথে সাধারণ বন্দিদের ন্যায় আচরণ করা ঠিক হবে না। তাই উনাদের জন্য একটা মুক্তিপণ ধার্য করা হোক। আর আমিই সেই মুক্তিপণ বাইতুল মালে জমা দিবো। উনাদেরকে পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার দাওয়াত দেয়া হবে। যদি উনারা পবিত্র দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করেন তবে পবিত্র মদীনা শরীফ উনার তিনজন যুবককে উনারা তিনজন স্বামী হিসেবে গ্রহণ করার ইখতিয়ার পাবেন। অথবা উনারা অন্য কোথাও গিয়ে স্বাধীনভাবে বসবাস করবেন।

হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার প্রস্তাব মুবারক সকলেই একবাক্যে মেনে নিলেন। শাহযাদী তিনজন মূলত পূর্বেই পবিত্র দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তথাপি মুবারক প্রস্তাব শুনে উনারা তৎক্ষণাত পবিত্র দ্বীন ইসলাম গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। অতঃপর প্রথম মেয়ে স্বয়ং খলীফা উনার আওলাদ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে, দ্বিতীয় মেয়ে হযরত মুহম্মদ ইবনে আবী বকর ছিদ্দীক্ব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে আর তৃতীয় মেয়ে নকশায়ে রসূল, ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে স্বামী হিসেবে পেতে আরজি পেশ করেন। সেই মুবারক মজলিসেই উনাদের বিবাহ বা শাদী মুবারক সুন্নতী কায়দায় সম্পন্ন হয়। আর এভাবেই পারস্য সম্রাটের তৃতীয় কন্যা হযরত আহলে বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের সাথে সম্পৃক্ত হন।

উল্লেখ্য যে, শাদী মুবারক উনার পর হযরত শহরবানু আলাইহাস সালাম উনার নাম মুবারক ‘সালমা’ মতান্তরে ‘গাযালা’ রাখা হয়। আর উনার পবিত্র রেহেম শরীফেই সাইয়্যিদুনা ইমামুর রাবি’ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ইমাম আলী আওসাত যাইনুল আবেদীন আলাইহিস সালাম এবং শহীদ কারবালা হযরত হযরত আলী আছগর আলাইহিস সালাম উনারা বিলাদত শরীফ গ্রহণ করেন।


আনুষ্ঠানিক খিলাফত ও ইমামত লাভ
লাখতে জিগারে হাবীবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইমামে মাদারযাদ। তথাপি বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে উনার বেমেছাল ফযীলত উনার উন্মেষ ঘটানো হয়েছে। আনুষ্ঠানিক খিলাফত ও ইমামত লাভের বিষয়টি কেবল তারই ধারাবাহিকতা।
৪৯ হিজরী সনের ২৮শে সফর সাইয়্যিদুনা হযরত ইমামুছ ছানী মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ইমাম হাসান আলাইহিস সালাম উনাকে মুনাফিকরা হিরক চূর্ণের ন্যায় জঘন্য বিষ পান করায়। শাহাদাত মুবারক গ্রহণের পূর্ব মুহূর্তে তিনি হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে সিনা ব-সিনা যাহিরী-বাতিনী নিয়ামতরাজি মুবারক হাদিয়া করেন। আর এভাবেই উনার ইমামতের আনুষ্ঠানিক অভিষেক সম্পন্ন হয়।

পবিত্র হিজরত মুবারক
মুসলিম মিল্লাতকে যাহিরী-বাতিনী ইলম, বিলায়েত, কামালত হাদিয়া করতঃ খালিছ আল্লাহওয়ালা-আল্লাহওয়ালী বানাতে হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নিজেকে সর্বদা ব্যাপৃত রাখতেন। মসজিদে নববী শরীফে উনার তালীম-তালকীন ও দরস-তাদরীস আর ফয়েজ বিতরণ নিত্য চালু ছিলো। পরশমণির মুবারক ছোহবত লাভের জন্য সর্বদা ভিড় লেগেই থাকতো। কিন্তু রহমতী মজলিস হতে উম্মাহকে বদবখত যালিম ইয়াযীদের জন্য মাহরুম হতে হয়েছে।
৬০ হিজরী সনে ইয়াযীদ সিংহাসনে আরোহণ করে হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বাইয়াত দাবি করে। কিন্তু কাফির ইয়াযীদের প্রতি বাইয়াত হতে তিনি অস্বীকার করেন। তাই উনার বাইয়াত আদায় করতে ইয়াযীদ বাহিনীর লোকেরা উনার প্রতি চাপ সৃষ্টি করে। যার কারণে তিনি ৬০ হিজরী সনের ৪ঠা পবিত্র শা’বান শরীফ সম্মানিত মদীনা শরীফ হতে পবিত্র মক্কা শরীফে হিজরত মুবারক করেন। অতঃপর শত শত চিঠির মাধ্যমে কুফাবাসী কর্তৃক আকুল আবেদনের প্রেক্ষিতে ৩রা যিলহজ্জ তিনি উনার আহাল-ইয়াল আলাইহিমুস সালামসহ ৭২ মতান্তরে ৮২ জন উনাদের এক কাফেলা পবিত্র মক্কা শরীফ হতে কুফার উদ্দেশ্য নিয়ে রওয়ানা দেন।


কারবালার প্রান্তরে
হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কারবালার প্রান্তরে তাশরীফ, জিহাদ, শাহাদাত প্রতিটি বিষয়ই নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেছেন। তথাপি প্রতিটি বিষয়ই বিশদ আলোচনার দাবি রাখে। কিন্তু কলাম বর্ধিত হওয়ার আশঙ্কায় আলোচনা করা সম্ভব নয়। তবে সারমর্ম হলো, পবিত্র মুহররমুল হারাম মাস উনার প্রথম দিকেই ইয়াযীদ বাহিনীর সৈন্যরা কাফিলাসহ উনাদের প্রতি যুলুম শুরু করে। যুলুমের চূড়ান্ত পর্যায়ে দুগ্ধপোষ্য হযরত আলী আছগর আলাইহিস সালাম তিনিসহ উনারা অনেকেই শাহাদাত মুবারক গ্রহণ করেন। নাঊযুবিল্লাহ!
[মুহম্মদিয়া জামিয়া শরীফ গবেষণা কেন্দ্র হতে প্রকাশিত ‘কারবালার হৃদয় বিদারক ইতিহাস’ নামক কিতাব মুবারকে এ বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে।]

আনুষ্ঠানিক খিলাফত প্রদান
নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র বিছাল মুবারক গ্রহণের পূর্ব মুহূর্তেও উম্মতের জন্য দুয়া, দয়া করেছেন। অনুরূপভাবে হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনিও কারবালার প্রান্তরের কঠিন মুহূর্তেও মুসলিম উম্মাহর তাযকীয়াহ ও নাজাতের বিষয়টি চিন্তা করেছেন। হযরত ইমামুছ ছালিছ আলাইহিস সালাম তিনি শাহাদাত মুবারক গ্রহণের ঠিক পূর্বে হযরত ইমাম যাইনুল আবেদীন আলাইহিস সালাম উনার নিকট উম্মাহর দায়িত্ব অর্পণ করেন। জাহিরী-বাতিনী নিয়ামতরাজি সিনা ব-সিনা সোপর্দ করেন। আর এভাবেই তিনি হযরত ইমাম যাইনুল আবেদীন আলাইহিস সালাম উনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে খিলাফত ও ইমামত প্রদান করেন। যার কারণে ইলমে তাছাওউফসহ ইলম উনার প্রতিটি শাখায় উনার সিলসিলা মুবারক অদ্যাবধি জারি রয়েছে এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত জারি থাকবে।


শাহাদাত মুবারক গ্রহণ
৬১ হিজরী সনের ১০ই মুহররমুল হারাম পবিত্র আশূরা শরীফে ইয়াওমুল জুমুয়াতি জুমুয়াহ ওয়াক্তে সাইয়্যিদুশ শুহাদা হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কারবালার প্রান্তরে শাহাদাত মুবারক গ্রহণ করেন। উনার জিসম মুবারকে ২১টি তীর, ৩৪টি বর্শা এবং ৪০টি তলোয়ারের আঘাত বিদ্ধ হয়। উনার পবিত্র শাহাদাত মুবারকের কারণে বেহুঁশ মানুষ ও জিন ব্যতীত সারা মাখলুকাতে শোকের ছায়া নেমে আসে। রক্তবৃষ্টি, গায়েবী কান্না ধ্বনি, পানি রক্তে পরিণত হওয়া, মাটি ও পাথর হতে রক্ত বের হওয়া, সূর্য গ্রহণ হওয়া ইত্যাদি তারই বাস্তব প্রমাণ। [এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে মুহম্মদিয়া জামিয়া শরীফ গবেষণা কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত “কারবালার হৃদয় বিদারক ইতিহাস” কিতাব মুবারক পাঠ করা অত্যন্ত জরুরী।]


পরিশিষ্ট
মূলত সাইয়্যিদু শাবাবি আহলিল জান্নাহ, সাইয়্যিদুশ শুহাদা, হযরত ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতি রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাওয়ানেহে উমরী মুবারক জানা, উনার প্রতি হুসনে যন রাখা এবং উনার সীরাত মুবারক হতে ইবরত-নছীহত মুবারক গ্রহণ করা সকলের জন্য ফরয। কেননা উনার মুহব্বত পবিত্র ঈমান উনার মূল। উনার ইতায়াত আমলের মূল। আর উনারই রেযামন্দি মুবারক নাজাতের মূল। মহান বারী তায়ালা তিনি মুসলিম মিল্লামতকে উনার মুহব্বতের বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর তাওফীক দান করুন।

সূত্র : দৈনিক আল ইহসান

বিষয় : হযরত আহলে বাইত শরীফ উনাদের ১২জন ইমাম আলাইহিমুস সালাম, ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইত, রসূলিল্লাহি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম, সাওয়ানেহে উমরী মুবারক
এই বিভাগ থেকে আরও পড়ুন
« পূর্ববর্তী| সব গুলি| পরবর্তী »